/> দিয়াশলাই কাঠি-রেশমি সুতায় দুর্গাপ্রতিমা, সাতক্ষীরায় তাক লাগানো শিল্পকর্ম - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

দিয়াশলাই কাঠি-রেশমি সুতায় দুর্গাপ্রতিমা, সাতক্ষীরায় তাক লাগানো শিল্পকর্ম

 


দিয়াশলাই কাঠি আর রেশমি সুতায় দুর্গা, সাতক্ষীরায় প্রতিমা তৈরিতে নতুন চমক


মাটির প্রতিমা তো অনেক দেখেছেন। কিন্তু দিয়াশলাইয়ের কাঠি আর রেশমি সুতায় তৈরি দেবী দুর্গার প্রতিমা কি কখনো দেখেছেন? শারদীয় দুর্গোৎসব সামনে রেখে এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দির। প্রচলিত মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামোর বাইরে এবার প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি এবং ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতার নিখুঁত কারুকাজে।


পূজা শুরু হতে এখনো বেশ কিছুদিন বাকি। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ। কেউ বিস্মিত হয়ে দেখছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, দুর্গাপূজার দিনগুলোতে সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা আসবেন এই প্রতিমা দেখতে।


মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমাশিল্পীরা রাত-দিন কাজ করছেন। মাটির অবয়বের ওপর একে একে বসানো হচ্ছে দিয়াশলাইর কাঠি। তার সঙ্গে রেশমি সুতার কারুকাজ। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাঠি বসাতে হচ্ছে শিল্পীদের। সামান্য ভুলেও নষ্ট হতে পারে পুরো নকশা। তাই প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম দুটিই লাগছে বেশি।



প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, আমরা ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত পরিশ্রম করে কাজ করছেন। কখনো কখনো রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।


আয়োজকরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি। এর সঙ্গে লাগছে ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। শুধু প্রতিমা তৈরির কাজেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবার পূজার আয়োজনের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।



ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সহ-ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর আমরা ধানের প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। তখন মোট খরচ হয়েছিল প্রায় তিন লাখ টাকা। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরি করায় খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রতিমাশিল্পীসহ সবকিছু মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হবে।



ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির এই আয়োজন অবশ্য ব্রহ্মরাজপুরে নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদযাপন কমিটি।



কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল শাকানু বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল আগামী বছর আরও আকর্ষণীয় কিছু করা হবে। সেই চিন্তা থেকেই এবার দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, সাতক্ষীরায় এমন আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে।



তার দাবি, বাংলাদেশে দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে এ ধরনের প্রতিমা তৈরির ঘটনা বিরল। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।



কারণ দিয়াশলাই কাঠি দাহ্য হওয়ায় প্রতিমাটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আয়োজকরা বলছেন, এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমায় বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সেটি প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে বলেও জানান তারা।



ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিমাটির দাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে দাহ্যতা কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর ট্রায়ালও করা হয়েছে।



প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসা স্থানীয়দের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না রানী বলেন, প্রতিবছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা আরও বেশি মানুষের আগ্রহ তৈরি করবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।



স্থানীয় এক নারী বলেন, গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের প্রতিমা হয়েছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা হচ্ছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।



শুধু দর্শনার্থীদের আকর্ষণ নয়, পূজাকে ঘিরে সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও গ্রামের মানুষ, পূজা কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।



প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকারের জন্যও এটি অন্যরকম একটি কাজ। তিনি জানান, ২০২৬ সালে চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটি সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। কাজ শেষ করার জন্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন শিল্পীরা।



এদিকে, সাতক্ষীরা জেলাজুড়েও দুর্গাপূজাকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও এর কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি পূজা হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।



বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ২০২৫ সালে ব্রহ্মরাজপুরে ধানের প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। যতটুকু কাজ হয়েছে, তাতে এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক হচ্ছে। আমরা আশা করছি, সাতক্ষীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এবার দর্শনার্থীরা এখানে আসবেন।



আয়োজকদের প্রত্যাশা, শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনজুড়ে এই মন্দির হয়ে উঠবে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। আর সেই আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকবে আগুন জ্বালানোর সাধারণ দিয়াশলাই কাঠি, যা শিল্পীর নিপুণ হাতে এবার রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গার অলংকারে।



মাটির সঙ্গে মিশে থাকা বিশ্বাস এবার যেন নতুনভাবে ধরা দিচ্ছে কাঠি ও সুতায়। দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি, ১০ কেজি রেশমি সুতা এবং কয়েকজন শিল্পীর দীর্ঘদিনের শ্রমে তৈরি এই প্রতিমা তাই শুধু পূজার প্রতীক নয়; সাতক্ষীরার সৃজনশীলতা ও স্থানীয় শিল্পভাবনারও এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad