বিশেষ প্রতিবেদন : অজয় মিত্র
বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে দোলযাত্রা বা দোল পূর্ণিমা কেবল একটি রঙের উৎসব নয়, এর গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক দর্শন। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত এই উৎসবটি অশুভের বিনাশ এবং প্রেমের জয়ের প্রতীক।
দোলযাত্রার ধর্মীয় প্রেক্ষাপট প্রধানত বৈষ্ণবীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা: দোল মূলত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার বৃন্দাবনে আবির খেলার স্মৃতি হিসেবে পালিত হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই শ্রীকৃষ্ণ রাধিকা ও অন্য গোপিনীদের সঙ্গে আবির খেলায় মেতেছিলেন। তাই বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ‘প্রেম ভক্তির’ প্রতীক।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব: বাংলার জন্য এই দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দের দোল পূর্ণিমার দিনেই নদীয়ার নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই কারণে এই দিনটি ‘গৌর পূর্ণিমা’ হিসেবেও পরিচিত।
অশুভের বিনাশ (হোলিকা দহন): পুরাণে বর্ণিত আছে, ভক্ত প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার জন্য হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা তাঁকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করেন। কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় প্রহ্লাদ রক্ষা পান এবং পাপিষ্ঠ হোলিকা ভস্মীভূত হন। এই ঘটনাটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়ের বার্তা দেয়।
সামাজিকভাবেও দোলযাত্রা মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা বয়ে আনে।
সাম্য ও মৈত্রী: রঙের উৎসবে উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের, জাত-পাতের ভেদাভেদ থাকে না। সবাই একে অপরকে আবিরে রাঙিয়ে দিয়ে সাম্যের বার্তা দেয়। এটি সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
বসন্তের আবাহন: দোলযাত্রা মানেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সেজে ওঠে, মানুষের মনেও তখন নতুন আনন্দ ও সজীবতার সঞ্চার হয়।
শান্তি ও আনন্দ: শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উৎসবকে ‘বসন্তোৎসব’ হিসেবে প্রবর্তন করেছিলেন, যা আজ বাংলার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গান, নাচ এবং আবিরের মধ্য দিয়ে এটি একটি শৈল্পিক ও শান্তিপূর্ণ রূপ পায়।
দোলযাত্রা সাধারণত দুই দিন ধরে পালিত হয়:
চাঁচড় বা ন্যাড়াপোড়া (হোলিকা দহন): মূল উৎসবের আগের দিন সন্ধ্যায় শুকনো গাছের ডাল, খড় ইত্যাদি দিয়ে একটি স্তূপ তৈরি করে তাতে আগুন জ্বালানো হয়। একে 'অশুভ শক্তির বিনাশ' হিসেবে দেখা হয়।
মূল দোলযাত্রা: পরদিন সকালে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে রাঙিয়ে পালকিতে বা দোলায় বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। ভক্তরা ভজন-কীর্তন গাইতে গাইতে রঙ খেলেন।
আবির ও রঙ খেলা: ছোটরা বড়দের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয় এবং সমবয়সীরা একে অপরকে রঙে রাঙিয়ে দেয়।
দোল ও হোলির পার্থক্য:
অনেকে দোলযাত্রা এবং হোলিকে এক মনে করলেও এর মধ্যে কিছুটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে:
মূলত বাংলা ও ওড়িশায় পালিত হয় দোলযাত্রা।উত্তর ও পশ্চিম ভারতে বেশি জনপ্রিয় হোলি।
রাধা-কৃষ্ণের দোল ও চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম এই দুইয়ে মিলেই দোলযাত্রা ও গৌর পূর্ণিমা।
হোলিকা দহন ও বসন্তের বিজয় নিয়েই হোলি।
দোল সাধারণত পূর্ণিমার দিনে পালন করা হয়।পূর্ণিমার পরের দিন পালন করা হয় হোলি।
দোলযাত্রা আমাদের শেখায় যে, হৃদয়ের কলুষতা মুছে ফেলে প্রেমের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে তোলাই হলো জীবনের প্রকৃত ও পবিত্র সার্থকতা।

No comments:
Post a Comment