বিশেষ প্রতিবেদন: অজয় মিত্র
বর্তমানে তো বটেই, সুদূর অতীতেও অনেকের কাছে সময়ে সময়ে আলোচ্য হয়ে উঠতো, 'বিয়ের পর সনাতনী নারীরা কেন সিঁদুর শাঁখা পলা পরবে?', 'পরলে কি হয়? না পরলেই বা ক্ষতি কি?', 'পরার কোন বাধ্যবাধকতা আছে কি নেই?', 'কেন শুধু সনাতনী নারীরাই এসব মানবে?', সবটাই বুজরুকি', 'শাস্ত্র বলতে কিছুই নেই, আমি আমার মতই মানি' - ইত্যাদি শত শত বিষয় ও যার যার মত মনগড়া ব্যাখ্যা, কার্যকরণে প্রকৃতই সেসবের কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না, নিছক খোঁড়া যুক্তি ও তর্কের খাতিরে তর্ক ছাড়া।
কথা হলো, এইসব বিষয়ে ব্যক্তি- পরিবার- সমাজ- সংসার রক্ষায় প্রচলিত রীতিনীতি ও শাস্ত্র কি বলে? জেনে নেওয়া যাক ধর্মীয় বিধি বিধান, লোকাচার ও শাস্ত্রের আলোকে কিছু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ...
হিন্দুধর্মে বিবাহিত নারীদের শাঁখা, সিঁদুর এবং পলা পরিধানের বিষয়টি কেবল অলংকার বা সাজসজ্জা নয়, এর পেছনে গভীর ধর্মীয়, সামাজিক এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।এটি স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা এবং দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
১. সিঁদুর (Sindoor):
সিঁদুরকে হিন্দুধর্মে সতীত্বের প্রতীক এবং শক্তির আধার মনে করা হয়।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা: দেবী পার্বতী তাঁর স্বামী শিবের মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরতেন। তাই হিন্দু নারীরা দেবী পার্বতীর আদর্শ অনুসরণ করে সিঁদুর পরেন যাতে তাদের স্বামী দীর্ঘজীবী হন। সমুদ্র মন্থন এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীতেও সিঁদুরের গুরুত্ব উল্লেখ আছে।
আধ্যাত্মিক কেন্দ্র: সিঁদুর কপালে ঠিক দুই ভ্রুর মাঝে বা সিঁথিতে লাগানো হয়, যেখানে 'আজ্ঞা চক্র' অবস্থিত। এটি একাগ্রতা এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ভেষজ গুণ: শাস্ত্রীয়ভাবে সিঁদুরে পারদ (Mercury) এবং হলুদ ব্যবহৃত হতো, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে (তবে বর্তমানে রাসায়নিক সিঁদুর এড়িয়ে চলাই শ্রেয়)।
২. শাঁখা ও পলা (Shakha and Pola):
শাঁখা ও পলা মূলত বাঙালি হিন্দু বিবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শাঁখা (Shakha): এটি শঙ্খ বা সামুদ্রিক ঝিনুক দিয়ে তৈরি। শঙ্খ পবিত্রতার প্রতীক। এটি দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদস্বরূপ পরিধান করা হয় যাতে সংসারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। শাঁখা শুভ্রতা বা পবিত্রতার প্রতীক।
পলা (Pola): এটি লাল প্রবাল (Red Coral) দিয়ে তৈরি। লাল রংটি শক্তি এবং প্রজনন ক্ষমতার প্রতীক। শাস্ত্রমতে, শাঁখা ও পলা একত্রে পরলে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং দাম্পত্য জীবনে ভারসাম্য বজায় থাকে।
৩. লোহা বাঁধানো (Iron Bangle):
শাঁখা-পলার সাথে অনেক নারী বাম হাতে লোহা পরেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, লোহা অশুভ দৃষ্টি এবং নেতিবাচক শক্তি থেকে নারীকে রক্ষা করে। এটি স্বামীর মঙ্গলের জন্য এবং সংসারের ভিত্তি মজবুত করার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
সনাতন ধর্মে এগুলোকে 'এয়োস্ত্রী' বা সধবা নারীর লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্মৃতিশাস্ত্র অনুযায়ী: মনুস্মৃতি বা অন্যান্য প্রাচীন সংহিতায় বিবাহিত নারীর বেশভূষার মাধ্যমে তার সামাজিক অবস্থান (বিবাহিত স্ট্যাটাস) প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক তাৎপর্য: এটি সমাজের কাছে একজন নারীর বিবাহিত পরিচয়ের একটি দৃশ্যমান চিহ্ন, যা তাকে সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্মান প্রদান করে।
সংস্কৃতিভেদে ভিন্নতা: উত্তর ভারতে যেমন 'মঙ্গলসূত্র' এবং 'বিছিয়া' (পায়ের আঙুলের আংটি) বাধ্যতামূলক, বাংলায় তেমনই 'শাঁখা-সিঁদুর'। অর্থাৎ, স্থানভেদে প্রতীকের পরিবর্তন হলেও মূল উদ্দেশ্য এক—স্বামীর কল্যাণ এবং দাম্পত্যের সীমানা রক্ষা।
"শাঁখা ও সিঁদুর কেবল বাহ্যিক চিহ্ন নয়, এটি একজন নারীর ভালোবাসা, ত্যাগ এবং তার পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি নীরব ঘোষণা।"
শাঁখা এবং সিঁদুরের মাহাত্ম্য বোঝার জন্য হিন্দু পুরাণের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান বা গল্প প্রচলিত আছে। একটি দেবী পার্বতী ও শিবের সাথে সম্পর্কিত, অন্যটি সমুদ্র মন্থনের ঘটনার সাথে।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দেবী সতী ও পার্বতীর সিঁদুর ব্যবহারের কাহিনী:
পৌরাণিক মতে, সিঁদুর হলো শক্তির প্রতীক। দেবী পার্বতী তাঁর স্বামী ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করতে এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতেন।
বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলন: দেবী সতী যখন দক্ষ যজ্ঞে প্রাণত্যাগ করেন, তখন শিব শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। পরবর্তী জন্মে পার্বতী রূপে দেবী যখন শিবকে পুনরায় স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেন, তখন তিনি সিঁদুরের মাধ্যমে নিজের 'সুহাগ' বা দাম্পত্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস: বলা হয়, সিঁদুর কপালে পরলে দেবী লক্ষ্মী সেখানে অবস্থান করেন এবং সংসারে শ্রী বৃদ্ধি পায়। আবার দেবী চণ্ডীর পুজোতেও সিঁদুর অপরিহার্য, যা অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক।
২. শাঁখা তৈরির নেপথ্যে—শঙ্খাসুর বধের কাহিনী:
শাঁখা (যা শঙ্খ দিয়ে তৈরি) ব্যবহারের পেছনে একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে:
শঙ্খাসুর ও তুলসী: প্রাচীনকালে শঙ্খাসুর নামে এক শক্তিশালী অসুর ছিল। তার স্ত্রী তুলসী (বৃন্দা) ছিলেন অত্যন্ত পতিব্রতা। তুলসীর সতীত্বের জোরে শঙ্খাসুর অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল।
শঙ্খের জন্ম: দেবতাদের মঙ্গলের জন্য ভগবান বিষ্ণু শঙ্খাসুরকে বধ করেন। অসুর হলেও সে ছিল বিষ্ণুর ভক্ত, তাই তার হাড় থেকে তৈরি হয় পবিত্র 'শঙ্খ'।
নারীদের অলংকার: কথিত আছে, শঙ্খাসুরের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী তুলসীর সতীত্ব এবং ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভগবান বিষ্ণু আশীর্বাদ করেন যে, তাঁর হাড় (শঙ্খ) দিয়ে তৈরি অলংকার বিবাহিত নারীরা পরিধান করবেন। এটি তাঁদের সতীত্ব রক্ষা করবে এবং স্বামীর জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। সেই থেকেই বিবাহিত হিন্দু নারীদের মধ্যে শাঁখা পরার প্রচলন শুরু হয়।
৩. সমুদ্র মন্থন ও লাল পলা:
সমুদ্র মন্থনের সময় লক্ষ্মী দেবীর উত্থান ঘটে। সেই মন্থন থেকে প্রাপ্ত নানা রত্নের মধ্যে প্রবাল (যা থেকে পলা তৈরি হয়) অন্যতম। লাল রঙকে হিন্দুধর্মে 'মঙ্গল' বা 'শুভ' সংকেত হিসেবে দেখা হয়। তাই সিঁদুরের লালের সাথে মিলিয়ে লাল পলা পরা হয় যাতে দাম্পত্য জীবনে কোনো অমঙ্গল না ঘটে।
একটি আকর্ষণীয় তথ্য (Scientific Touch):
পৌরাণিক গল্পের পাশাপাশি একটি প্রাচীন বিশ্বাস হলো, শাঁখা ও পলা হাতের নির্দিষ্ট কিছু অ্যাকুপ্রেশার পয়েন্টে চাপ সৃষ্টি করে, যা নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে বলে মনে করা হতো।
শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শাঁখা সিঁদুর পরার প্রধান ব্যাখ্যাগুলো তুলে ধরা হলো:
১. সিঁদুরের শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
হিন্দুশাস্ত্রে সিঁদুরকে 'সুহাগ' বা সধবা হওয়ার প্রধান চিহ্ন ধরা হয়।
শক্তির প্রতীক: লাল রং হলো দেবী দুর্গা বা মহাশক্তির প্রতীক। শাস্ত্র অনুযায়ী, সিঁথিতে সিঁদুর পরার অর্থ হলো নারী তার স্বামীর রক্ষাকবচ হিসেবে নিজের মধ্যে দৈব শক্তি ধারণ করছেন।
আজ্ঞা চক্রের সুরক্ষা: যোগশাস্ত্র ও তন্ত্রশাস্ত্র মতে, আমাদের কপালে দুই ভ্রুর মাঝখানে 'আজ্ঞা চক্র' বা তৃতীয় নয়ন অবস্থিত। সিঁদুর এই স্থানে লাগানো হয় যাতে মন স্থির থাকে এবং অশুভ চিন্তা দূর হয়। এটি নারীর মানসিক শক্তি ও বুদ্ধিকে জাগ্রত রাখে।
দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ: পুরাণে উল্লেখ আছে যে, সিঁদুর পরলে দেবী লক্ষ্মী তুষ্ট হন। কারণ লক্ষ্মী শ্রী এবং সমৃদ্ধির দেবী, আর বিবাহিত নারীর সিঁদুর সেই শ্রীবৃদ্ধিরই প্রতীক।
২. শাঁখার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
শাঁখা তৈরি হয় সমুদ্রের শঙ্খ থেকে, যা হিন্দুধর্মে অত্যন্ত পবিত্র।
শঙ্খের পবিত্রতা: শঙ্খ হলো ভগবান বিষ্ণুর প্রিয় বস্তু। শাস্ত্রমতে, শঙ্খের মধ্যে অশুভ শক্তি বিনাশ করার ক্ষমতা রয়েছে। শাঁখা পরলে নারীর চারপাশে একটি ইতিবাচক বলয় তৈরি হয় যা পরিবারকে নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে।
চন্দ্র ও মনের সংযোগ: জ্যোতিষশাস্ত্রে শঙ্খকে চন্দ্রের (Moon) সাথে তুলনা করা হয়। চন্দ্র মনের কারক। শাঁখা পরলে নারীর মন শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকে, যা একটি সংসার পরিচালনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সতীর আদর্শ: শঙ্খাসুর বধের কাহিনী অনুযায়ী, শাঁখা সতিত্ব এবং স্বামীভক্তির প্রতীক। এটি পরিধানের মাধ্যমে নারী তার স্বামীর প্রতি একনিষ্ঠ থাকার সংকল্প ব্যক্ত করেন।
৩. পলার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
পলা তৈরি হয় লাল প্রবাল (Coral) দিয়ে, যা মঙ্গল গ্রহের রত্ন হিসেবে পরিচিত।
মঙ্গল দোষ খণ্ডন: জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, লাল পলা পরলে 'মঙ্গল' গ্রহের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটি দাম্পত্য কলহ রোধ করে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।
রক্ত ও স্বাস্থ্য: আয়ুর্বেদ ও শাস্ত্রীয় মতে, লাল রং জীবনীশক্তির প্রতীক। এটি নারীর রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
শাস্ত্রীয় বাধ্যবাধকতা ও নিয়ম
স্মৃতিশাস্ত্র এবং বিভিন্ন আচার-সংহিতায় বিবাহিত নারীর জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের কথা বলা হয়েছে:
শাস্ত্রীয় তাৎপর্য
অখণ্ডতা শাঁখা বা পলা ভেঙে গেলে তা অমঙ্গলজনক মনে করা হয়। এটি দাম্পত্যের অটুট বন্ধনের প্রতীক।
সিঁথির অবস্থান সিঁদুর একদম কপাল থেকে সিঁথির শেষ পর্যন্ত পরাকে স্বামীর দীর্ঘায়ুর প্রতীক মনে করা হয়।
বাম হাত লোহা বাঁধানো সাধারণত বাম হাতে পরা হয়, যা শরীরের বাম দিকের (চন্দ্র নাড়ী) শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সারকথা: শাস্ত্রীয় মতে, এই চিহ্নগুলো ধারণ করার মাধ্যমে একজন নারী নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের আদ্যাশক্তি বা প্রকৃতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি তার 'পুরুষ' বা স্বামীকে রক্ষা করেন।
শাঁখা এবং সিঁদুরের গুরুত্ব নিয়ে পুরাণ এবং উপনিষদীয় দর্শনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। বেদে সরাসরি 'শাঁখা-পলা'র নাম আধুনিক রূপের মতো না থাকলেও, 'মঙ্গল চিহ্ন' এবং 'সিঁদুর' বা 'রক্তবর্ণ চূর্ণের' উল্লেখ পাওয়া যায়।
নিচে পুরাণ ও শাস্ত্রীয় সূত্রের আলোকে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. পুরাণ অনুযায়ী ব্যাখ্যা (Puranic Explanation)
পুরাণগুলোতে দেবী শক্তির সাথে সিঁদুর ও শঙ্খের নিবিড় সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ: এই পুরাণে শঙ্খাসুর বধের কাহিনী বিস্তারিত আছে। সেখানে বলা হয়েছে, শঙ্খাসুরের অস্থির অংশ (শঙ্খ) অত্যন্ত পবিত্র এবং এটি পরিধান করলে নারী 'সধবা' বা 'এয়োস্ত্রী' হিসেবে সুরক্ষিত থাকেন। এটি মূলত সতীত্বের জয়গান গায়।
ললিতা সহস্রনাম (ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ): এখানে দেবীকে 'সিন্দুর-তিলকাঞ্চিতা' (যাঁর কপালে সিঁদুরের তিলক শোভা পায়) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, সিঁদুর হলো সৌভাগ্য এবং বিজয়ের প্রতীক।
কালিকা পুরাণ: এই পুরাণ মতে, সিঁদুর হলো কামাখ্যা দেবীর আশীর্বাদস্বরূপ। এটি পরলে নেতিবাচক শক্তি বা 'অলক্ষ্মী' দূরে থাকে।
২. বৈদিক ও উপনিষদীয় দর্শন (Vedic Perspective)
বেদে সরাসরি অলংকারের চেয়ে 'রং' এবং 'শক্তির' গুরুত্ব বেশি।
সৌরশক্তি ও সিঁদুর: ঋগ্বেদে উদীয়মান সূর্যের রক্তিম আভাকে শক্তির উৎস বলা হয়েছে। সিঁদুর সেই সূর্যের লাল রঙের প্রতীক। সিঁথিতে সিঁদুর পরা মানে হলো শরীরের ঊর্ধ্বাংশে (মস্তিষ্কে) সূর্যের তেজকে ধারণ করা, যা বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণ রাখে।
শঙ্খের নাদ: বেদে শঙ্খকে 'বিজয়ধ্বনি' বা মঙ্গলের প্রতীক ধরা হয়। অথর্ববেদে শঙ্খকে রোগ ও অশুভ শক্তি বিনাশকারী বলা হয়েছে। যেহেতু নারী সংসার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাই তাঁর হাতে শঙ্খের অবস্থান সংসারের শান্তি রক্ষা করে।
৩. তন্ত্র শাস্ত্রের ব্যাখ্যা
তন্ত্র শাস্ত্রে মানুষের শরীরকে একটি যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়।
বিন্দু ও শক্তি: সিঁদুরকে বলা হয় 'রক্তবিন্দু'। এটি নারীশক্তির প্রতীক। আর কপালে যেখানে সিঁদুর লাগানো হয়, সেখানে আমাদের পিটুইটারি ও পিনিয়াল গ্রন্থি থাকে। তন্ত্র মতে, সিঁদুরের চাপ ও স্পর্শ এই গ্রন্থিগুলোকে সক্রিয় রাখে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
শঙ্খের শীতলতা: তন্ত্রে বিশ্বাস করা হয়, শঙ্খের সংস্পর্শ শরীরকে শীতল রাখে এবং অতিরিক্ত উত্তেজনা প্রশমন করে।
৪. শাস্ত্রীয় বিধানের সারসংক্ষেপ
শাস্ত্রে এই অলংকারগুলোর তিনটি প্রধান দিক তুলে ধরা হয়েছে:
শাস্ত্রীয় দিক তাৎপর্য
আচার:
এটি বিবাহিত জীবনের একটি সামাজিক ও ধর্মীয় স্বীকৃতি।
সংস্কার:
এটি পরিধানের মাধ্যমে নারী তার বংশ রক্ষা ও স্বামীর মঙ্গলের শপথ গ্রহণ করেন।
রক্ষা:
শাঁখা, সিঁদুর ও লোহাকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একটি 'বর্ম' বা রক্ষাকবচ মনে করা হয়।
একটি বিশেষ তথ্য: অনেক প্রাচীন গ্রন্থে সিঁদুরকে 'মঙ্গলাষ্টক' বা আটটি শুভ বস্তুর অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এটি পরার সময় মনে করা হয় যে, নারী তাঁর অর্ধাঙ্গ (স্বামী) এর অর্জিত পুণ্য ও আয়ু ভাগ করে নিচ্ছেন।
হিন্দু বিবাহে 'সিন্দুরদান' বা সিঁদুর পরানোর সময় যে মন্ত্রটি পাঠ করা হয়, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মন্ত্রের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কেন একজন নারীর জন্য সিঁদুর পরা শাস্ত্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে প্রচলিত মন্ত্রটি হলো:
"ওঁ সুমঙ্গলীমিয়ং বধূরিমাং পশ্যত সমেত।
সৌভাগ্যমস্যৈ দত্ত্বায়াথাস্তং বি পরেতন।।"
মন্ত্রের সহজ বাংলা অর্থ:
"হে সমবেত অতিথিগণ! এই বধূ পরম সৌভাগ্যবতী (সুমঙ্গলী)। আপনারা সকলে একে আশীর্বাদ করুন। আপনারা একে সৌভাগ্য প্রদান করে যার যার গৃহে গমন করুন।"
শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও বাধ্যবাধকতার ৫টি মূল কারণ:
বিবাহের সময় এই মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সিঁদুর পরানোর পর থেকেই এটি নারীর জন্য 'বাধ্যবাধকতা' বা 'নিত্য কর্ম' হয়ে দাঁড়ায়। এর শাস্ত্রীয় কারণগুলো হলো:
১. 'সুমঙ্গলী' বা সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া
শাস্ত্রে অবিবাহিত কন্যাকে 'কুমারী' এবং বিবাহিতাকে 'সুমঙ্গলী' বলা হয়। সিঁদুর হলো সেই 'মঙ্গল' বা শুভশক্তির দৃশ্যমান চিহ্ন। সিঁদুর না পরলে শাস্ত্রীয় মতে সেই নারী অমঙ্গলের শিকার হতে পারেন বা তার সৌভাগ্য ক্ষুণ্ণ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।
২. অধিকার ও স্বীকৃতির প্রতীক
মন্ত্রে বলা হয়েছে 'ইমং পশ্যত' (একে দেখ)। অর্থাৎ, সিঁদুর হলো সমাজের কাছে এবং দেবতাদের কাছে ওই নারীর বিবাহিত অবস্থার ঘোষণা। এটি তাকে পরপুরুষের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করে এবং সংসারে তার একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
৩. প্রাণশক্তির সঞ্চার
সিঁদুরকে বলা হয় 'রক্তবর্ণ চূর্ণ'। হিন্দু দর্শনে লাল রং হলো 'রজঃ' গুণ বা প্রাণশক্তির প্রতীক। স্বামী যখন স্ত্রীর সিঁথিতে সিঁদুর দান করেন, তখন তিনি মূলত নিজের জীবনের অর্ধেক শক্তি এবং দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর অর্পণ করেন। শাস্ত্রমতে, সিঁদুর না পরলে এই শক্তিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
৪. যমরাজ ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা (সাবিত্রী উপাখ্যান)
মহাভারতের সতী সাবিত্রীর কাহিনীতে দেখা যায়, তিনি তাঁর সতীত্ব এবং সিঁদুরের জোরে যমরাজের হাত থেকে স্বামী সত্যবানকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। শাস্ত্রে বিশ্বাস করা হয়, সিঁদুর পরিহিতা নারীর সিঁথির দিকে তাকালে যমরাজও থমকে যান, যা স্বামীর অকাল মৃত্যু রোধ করে। এটিই মূলত **'পতির আয়ু বৃদ্ধি'**র শাস্ত্রীয় ভিত্তি।
৫. শরীরের 'বিন্দু' রক্ষা
যোগশাস্ত্রে বলা হয়, কপালে যেখানে সিঁদুর পরা হয়, সেখানে মানুষের জীবনীশক্তির কেন্দ্র বা 'বিন্দু' থাকে। সিঁদুর ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিন্দুকে সুরক্ষিত রাখা হয়, যা নারীর ধৈর্য ও সহ্যশক্তি বৃদ্ধি করে—যা একটি পরিবার ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য।
সারকথা
শাস্ত্রীয়ভাবে শাঁখা ও সিঁদুর পরা কেবল একটি প্রথা নয়, এটি একজন নারীর 'আধ্যাত্মিক বর্ম'। এটি পরার মাধ্যমে নারী প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি তার স্বামীর বংশ রক্ষা করবেন এবং বিনিময়ে স্বামী তাকে সামাজিক ও আত্মিক সুরক্ষা দেবেন।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সিঁদুর পরার সময় যদি তা নাক বা কপালে কিছুটা ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটি আরও বেশি শুভ বলে গণ্য হয়।
শাঁখা এবং পলা পরার ক্ষেত্রে হিন্দুশাস্ত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধিনিষেধ রয়েছে। শাস্ত্রমতে, এগুলো কেবল গয়না নয়, বরং স্বামীর মঙ্গলের জন্য ধারণ করা 'আয়ুধ' বা অস্ত্র (অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে)।
নিচে এর নিয়ম ও বিধিনিষেধগুলো বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. পরার সঠিক নিয়ম
বিয়ের সময়: বিয়ের মূল অনুষ্ঠানে 'কুশণ্ডিকা' বা সিন্দুরদানের আগে শাঁখা-পলা পরানো হয়। অনেক জায়গায় কন্যাপক্ষ বা বরের মা এগুলো উপহার দেন।
ক্রম বা সিরিয়াল: সাধারণত প্রথমে শাঁখা (সাদা), তারপর পলা (লাল) এবং শেষে লোহা পরা হয়। শাস্ত্রীয় মতে, সাদা রং পবিত্রতার আর লাল রং শক্তির প্রতীক—এই দুইয়ের সমন্বয়ে জীবন ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।
হাত নির্বাচন: বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে সাধারণত দুই হাতেই শাঁখা-পলা পরা হয়। তবে লোহা বাঁধানো সাধারণত বাম হাতে পরার নিয়ম, কারণ বাম দিককে 'চন্দ্র নাড়ী' বা হৃদয়ের দিক ধরা হয়।
২. খুলে ফেলার শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ
শাস্ত্রে সধবা নারীর জন্য শাঁখা-পলা খুলে রাখা বা না পরা নিয়ে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে:
শোকের সময় নয়: অন্য কোনো অলংকার খুললেও শোকের সময় (পরিবারের কারো মৃত্যুতে) শাঁখা-পলা খোলা নিষিদ্ধ। এটি কেবল বৈধব্যের ক্ষেত্রেই বিসর্জন দেওয়া হয়।
শূন্য হাত: শাস্ত্রীয় বিশ্বাস মতে, বিবাহিত নারীর হাত কখনো 'শূন্য' বা অলংকারহীন রাখা উচিত নয়। একে 'লক্ষ্মীছাড়া' দশা বলা হয়। যদি কোনো কারণে শাঁখা খুলতে হয়, তবে অন্তত একটি সুতো বা লোহা হাতে রাখা জরুরি।
রাতের নিয়ম: ঘুমানোর সময়ও এগুলো খুলে রাখা শাস্ত্রে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ বিপদ বা অমঙ্গল যেকোনো সময় আসতে পারে আর শাঁখা-পলা তখন রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
৩. শাঁখা বা পলা ভেঙে গেলে করণীয়
শাস্ত্রে শাঁখা ভেঙে যাওয়াকে 'অশুভ সংকেত' বা স্বামীর ওপর বিপদের আশঙ্কা হিসেবে দেখা হয়। এর প্রতিকার হিসেবে কিছু নিয়ম পালন করা হয়:
বিসর্জন: ভেঙে যাওয়া শাঁখা বা পলা ডাস্টবিনে না ফেলে কোনো পবিত্র জলাশয়ে বা গাছের নিচে বিসর্জন দিতে হয়।
নতুন ধারণ: শাঁখা ভেঙে গেলে দ্রুত নতুন একজোড়া শাঁখা পরে নিতে হয়। অনেক জায়গায় নতুন শাঁখা পরার আগে সামান্য মিষ্টি মুখ করার নিয়ম আছে যাতে অমঙ্গল কেটে যায়।
সতর্কতা: সূর্যাস্তের পর সাধারণত নতুন শাঁখা পরা হয় না; এটি দিনের আলোয় বা শুভক্ষণে পরা ভালো।
৪. লোহা বাঁধানোর বিশেষত্ব
শাঁখা ও পলার সাথে লোহা পরা নিয়ে একটি প্রচলিত শাস্ত্রীয় ধারণা আছে। লোহা হলো শনি দেবের ধাতু। বিশ্বাস করা হয় যে, লোহা পরলে শনি বা রাহুর মতো অশুভ গ্রহের কুদৃষ্টি থেকে সংসার এবং স্বামী রক্ষা পান। এছাড়া এটি শরীরের 'নেতিবাচক তড়িৎ' শোষণ করে মনকে শান্ত রাখে।
একটি বিশেষ শাস্ত্রীয় টিপস:
শাস্ত্রে বলা হয়, বিবাহিত নারীর শাঁখা ও সিঁদুর যত উজ্জ্বল এবং পরিষ্কার থাকবে, তার গৃহের 'শ্রী' বা সমৃদ্ধি তত বৃদ্ধি পাবে। তাই এগুলোকে নিয়মিত যত্ন সহকারে পরিষ্কার রাখা উচিত।
শিব পুরাণে শাঁখা এবং সিঁদুরের ব্যবহার নিয়ে অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। শিব পুরাণ মূলত শিব ও শক্তির অভিন্নতাকে তুলে ধরে, আর শাঁখা-সিঁদুর সেই শক্তিরই প্রতীক।
নিচে শিব পুরাণের আলোকে এর ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হলো:
১. সিঁদুর: সতীর রক্ত ও শিবের সোহাগ
শিব পুরাণের 'রুদ্র সংহিতা' অংশে দেবী সতী ও পার্বতীর উপাখ্যানে সিঁদুরের মহিমা বর্ণিত হয়েছে।
শক্তির আধার: শিব পুরাণে সিঁদুরকে মহাদেব ও মহাদেবীর মিলনের প্রতীক ধরা হয়। লাল রঙটি 'রজঃ' গুণের প্রতীক, যা সৃষ্টি এবং সচলতার উৎস। শিব যখন শান্ত ও নির্গুণ, তখন শক্তি (পার্বতী) সগুণ ও সক্রিয়। সিঁদুর পরিধানের মাধ্যমে নারী নিজের মধ্যে সেই সক্রিয় শক্তিকে ধারণ করেন যা তার স্বামীকে (যিনি শিবের প্রতীক) রক্ষা করে।
অকাল মৃত্যু রোধ: শিব পুরাণে বর্ণিত আছে যে, যে নারী নিষ্ঠার সাথে সিঁদুর পরেন, কালভৈরব বা যমরাজ তাঁর স্বামীর আয়ু হরণ করতে দ্বিধা বোধ করেন। কারণ সিঁদুর হলো স্বয়ং আদ্যাশ্যক্তির কবচ।
২. শঙ্খ (শাঁখা): শঙ্খচূড় ও তুলসীর উপাখ্যান
শিব পুরাণের 'যুদ্ধ খণ্ড'-এ শঙ্খচূড় (যাকে অন্য পুরাণে শঙ্খাসুর বলা হয়) নামক এক অসুরের কাহিনী আছে। এটিই শাঁখা ব্যবহারের প্রধান শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
বিষ্ণুর বর ও হাড়ের পবিত্রতা: শঙ্খচূড় ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাঁর স্ত্রী তুলসী ছিলেন পরম সতী। শিবের সাথে যুদ্ধের পর যখন শঙ্খচূড় নিহত হন, তখন তাঁর দেহ থেকে 'শঙ্খ' উৎপন্ন হয়।
শিবের প্রিয় বস্তু: শিব পুরাণে বলা হয়েছে, শঙ্খ ভগবান শিবের অত্যন্ত প্রিয় (যদিও শিব পুজোয় শঙ্খ বাজানো নিষেধের কিছু বিশেষ কারণ আছে, কিন্তু শঙ্খকে মাঙ্গলিক ধরা হয়)।
নারীর ভূষণ: শঙ্খচূড়ের মৃত্যুর পর তাঁর অস্থি বা শঙ্খকে পবিত্র ঘোষণা করা হয় এবং বলা হয় যে, সতী নারীগণ এটি ধারণ করলে তাঁদের স্বামীর পুণ্য ও আয়ু বৃদ্ধি পাবে। শাঁখা পরার অর্থ হলো—স্বামীকে রক্ষা করার জন্য নিজের সতীত্ব ও শুদ্ধতাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করা।
৩. অর্ধাঙ্গিনী তত্ত্ব
শিব পুরাণের মূল দর্শন হলো 'অর্ধনারীশ্বর'।
একাত্মতা: শিব ও শক্তি যেমন আলাদা নন, তেমনি বিবাহিত জীবনে স্বামী ও স্ত্রী এক ও অভিন্ন। শাঁখা ও সিঁদুর হলো সেই 'অর্ধনারীশ্বর' রূপের সামাজিক ও ধর্মীয় স্বীকৃতি।
বিন্দু ও রেখা: কপালে সিঁদুরের বিন্দুটি 'শিব' (পুরুষ) এবং দীর্ঘ সিঁথিটি 'শক্তি' (নারী)-র মিলনরেখা হিসেবে কল্পনা করা হয়। এটি নির্দেশ করে যে, স্ত্রী তার স্বামীর আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশীদার।
শিব পুরাণের বিশেষ বিধিনিষেধ:
শিব পুরাণে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, একজন বিবাহিত নারী যদি স্বেচ্ছায় বা অবহেলায় শাঁখা ও সিঁদুর ত্যাগ করেন, তবে তার গৃহের 'শিবত্ব' (মঙ্গলময়তা) নষ্ট হয় এবং সেখানে 'অলক্ষ্মী' বা অমঙ্গল প্রবেশ করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট: শিব পুরাণ অনুযায়ী, শঙ্খের ধ্বনি যেমন ভূত-প্রেত ও নেতিবাচক শক্তি তাড়ায়, তেমনি নারীর হাতের শাঁখার ঘর্ষণ বা শব্দ গৃহের অশুভ শক্তিকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।
শিব পুরাণ ও দেবী ভাগবত অনুযায়ী, শঙ্খচূড় ও তুলসীর কাহিনীটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং এটিই শাঁখা ব্যবহারের মূল ভিত্তি। এই কাহিনীটি ত্যাগ, সতীত্ব এবং দৈব চক্রান্তের এক মিলনস্থল।
নিচে কাহিনীটি বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. শঙ্খচূড়ের পরিচয় ও শক্তি
পূর্বজন্মে শঙ্খচূড় ছিলেন ভগবান কৃষ্ণের সখা সুদামা। এক অভিশাপের কারণে তিনি দানব কুলে 'শঙ্খচূড়' নামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং বীর। তিনি ভগবান ব্রহ্মার তপস্যা করে একটি বিজয় কবচ লাভ করেন। ব্রহ্মা তাঁকে বর দেন যে, যতক্ষণ তাঁর শরীরে এই কবচ থাকবে এবং তাঁর স্ত্রী তুলসীর সতীত্ব বজায় থাকবে, ততক্ষণ তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না।
২. তুলসীর সতীত্ব ও শক্তির উৎস
শঙ্খচূড়ের স্ত্রী ছিলেন তুলসী (যিনি বৃন্দা নামেও পরিচিত)। তিনি ছিলেন পরম পতিব্রতা এবং নারায়ণের ভক্ত। তাঁর সতীত্বের তেজে শঙ্খচূড় এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে, তিনি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জয় করে দেবতাদের তাড়িয়ে দেন। এমনকি দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁর কাছে পরাজিত হন।
৩. শিবের সাথে যুদ্ধ
দেবতারা নিরুপায় হয়ে ভগবান শিবের শরণাপন্ন হন। শিব যখন শঙ্খচূড়ের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, তখন দেখা গেল মহাদেবও তাঁকে পরাজিত করতে পারছেন না। কারণ তুলসীর সতীত্ব এবং শঙ্খচূড়ের কবচ তাঁকে রক্ষা করছিল। শঙ্খচূড় শিবের ত্রিশূলের আঘাতও সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন।
৪. বিষ্ণুর ছদ্মবেশ ও কবচ হরণ
যুদ্ধ থামাতে এবং ধর্ম রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু একটি কৌশল অবলম্বন করেন:
প্রথমে তিনি এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে শঙ্খচূড়ের কাছে গিয়ে তাঁর 'বিজয় কবচ' দান হিসেবে চেয়ে নেন। শঙ্খচূড় দানবীর হওয়ায় সেটি দিয়ে দেন।
এরপর বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের রূপ ধরে তুলসীর প্রাসাদে যান। তুলসী মনে করেন তাঁর স্বামী যুদ্ধ জয় করে ফিরেছেন, ফলে তিনি বিষ্ণুকে নিজের স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে তুলসীর সতীত্ব ভঙ্গ হয়।
৫. শঙ্খের উৎপত্তি ও শাঁখার মাহাত্ম্য
তুলসীর সতীত্ব ভঙ্গ হওয়া মাত্রই শিবের ত্রিশূলে শঙ্খচূড় ভস্মীভূত হন।
অস্থি থেকে শঙ্খ: শঙ্খচূড়ের হাড় বা অস্থিগুলো সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয় এবং সেখান থেকেই শঙ্খের উৎপত্তি হয়।
বিষ্ণুর আশীর্বাদ: তুলসী যখন বুঝতে পারেন তাঁর সাথে ছলনা করা হয়েছে, তিনি বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হন। তখন বিষ্ণু তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, "শঙ্খচূড় আসলে আমারই অংশ (সুদামা) ছিল। এখন থেকে তোমার নাম হবে 'তুলসী' এবং তুমি আমার প্রিয় হবে। আর তোমার স্বামীর অস্থি (শঙ্খ) হবে পরম পবিত্র।"
বিষ্ণু আরও ঘোষণা করেন যে, যেকোনো বিবাহিত নারী যদি এই শঙ্খ দিয়ে তৈরি অলংকার (শাঁখা) পরিধান করেন, তবে তিনি তুলসীর মতোসতীত্বের তেজ লাভ করবেন এবং তাঁর স্বামীর অকাল মৃত্যু হবে না।
৬. কেন এটি 'বাধ্যবাধকতা'?
শিব পুরাণের এই কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয় যে:
সতীত্বের প্রতীক: শাঁখা পরা মানে হলো নারী নিজেকে তুলসীর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
বিজয় ও রক্ষা: শঙ্খ যেহেতু বিজয়ের প্রতীক, তাই এটি হাতে থাকলে স্বামীর কর্মক্ষেত্রে জয়লাভ নিশ্চিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
পবিত্রতা: শঙ্খ থেকে তৈরি হওয়ায় এটি পরলে কোনো অশুভ আত্মা বা প্রেতাত্মা নারীর ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না।
৭. লাল পলা কেন পরা হয়?
শাঁখার সাথে লাল পলা পরার কারণ হলো, তুলসীর রক্ত এবং শক্তির প্রতীক হিসেবে লাল রঙকে গণ্য করা হয়। লাল পলা মঙ্গল গ্রহের অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে, যা দাম্পত্য কলহ দূর করতে সাহায্য করে।
সারসংক্ষেপ: শাঁখা এবং সিঁদুর হলো মূলত তুলসী ও পার্বতীর আশীর্বাদ।শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, এগুলো সধবা নারীর জন্য কেবল অলংকার নয়, বরং স্বামীর জীবন রক্ষার একটি 'আধ্যাত্মিক ইন্স্যুরেন্স'।
শাঁখা-সিঁদুরের কাহিনীর সাথে তুলসী (বৃন্দা) এবং নারায়ণের (বিষ্ণু) সম্পর্কটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং আধ্যাত্মিক। শিব পুরাণে শঙ্খচূড় বধের পর তুলসীর যে রূপান্তর ঘটে, সেটিই হিন্দুধর্মে তুলসী গাছকে সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্রতার আসনে বসিয়েছে।
নিচে তুলসী মাহাত্ম্যের শাস্ত্রীয় কারণগুলো দেওয়া হলো:
১. তুলসীর অভিশাপ ও বিষ্ণুর পাথর হওয়া
বিষ্ণু যখন শঙ্খচূড়ের রূপ ধরে তুলসীর সতীত্ব ভঙ্গ করেন, তখন তুলসী সত্য জানতে পেরে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন।তিনি বিষ্ণুকে অভিশাপ দিয়ে বলেন:
"তুমি পাষাণের মতো হৃদয়হীন আচরণ করেছ, তাই তুমি 'শিলীভূত' (পাথর) হয়ে যাও।"
এই অভিশাপের ফলেই ভগবান বিষ্ণু গণ্ডকী নদীর তীরে 'শালগ্রাম শিলা' (কালো পাথর) রূপে অবস্থান করেন। আজও হিন্দু পরিবারে শালগ্রাম শিলার পূজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. বিষ্ণুর বর ও তুলসীর রূপান্তর
বিষ্ণু তুলসীর ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে বর দেন। তিনি বলেন:
"তোমার এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করে তুমি 'তুলসী' নামক পবিত্র উদ্ভিদে পরিণত হবে।"
"স্বর্গে তুমি লক্ষ্মী হিসেবে আমার সাথে থাকবে, আর মর্ত্যে তুমি তুলসী গাছ হিসেবে আমার অর্চনায় থাকবে।"
শর্ত: "আমি তুলসী পাতা ছাড়া কোনো নৈবেদ্য বা পূজা গ্রহণ করব না।" (এ কারণেই শ্রীকৃষ্ণের ভোগ বা বিষ্ণুর চরণে তুলসী পাতা অপরিহার্য)।
৩. তুলসী কেন 'বিষ্ণুপ্রিয়া'?
শাস্ত্রমতে, তুলসী গাছ হলো স্বয়ং লক্ষ্মীর অবতার।
পবিত্রতা: তুলসী গাছ যেখানে থাকে, সেখানে যমদূত বা নেতিবাচক শক্তি প্রবেশ করতে পারে না।
শুদ্ধিকরণ: তুলসী তলার মাটি এবং বাতাস চারপাশকে জীবাণুমুক্ত ও আধ্যাত্মিকভাবে শুদ্ধ রাখে।
বিবাহ (তুলসী বিবাহ): কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে (উত্থান একাদশী) আজও ধুমধাম করে তুলসী গাছের সাথে শালগ্রাম শিলার (বিষ্ণু) বিয়ে দেওয়া হয়।এটি দাম্পত্য সুখের জন্য অত্যন্ত শুভ অনুষ্ঠান।
৪. শাঁখা-সিঁদুরের সাথে সংযোগ
এখানেই শাঁখা-সিঁদুরের সাথে তুলসীর মাহাত্ম্য মিলে যায়:
সতীর প্রতীক: তুলসী যেমন তার সতীত্বের তেজে শঙ্খচূড়কে অমর করে তুলেছিলেন, শাঁখা পরিহিতা নারীও তেমনি তার ভক্তির জোরে স্বামীর অমঙ্গল রোধ করেন।
বিষ্ণুর সুরক্ষা: শাঁখা (শঙ্খ) বিষ্ণুর হাতে থাকে, আর তুলসী বিষ্ণুর চরণে। তাই শাঁখা ও তুলসী এই দুটির মাধ্যমেই নারী বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ করেন।
আয়ু বৃদ্ধি: বিশ্বাস করা হয়, যে বাড়িতে তুলসী গাছ আছে এবং যে নারী শাঁখা-সিঁদুর ধারণ করেন, সেই বাড়িতে অকাল মৃত্যু বা দারিদ্র্য বাসা বাঁধতে পারে না।
৫. বিজ্ঞানসম্মত কারণ (Ayurvedic logic)
শাস্ত্রের পাশাপাশি আয়ুর্বেদেও তুলসীকে 'মহৌষধি' বলা হয়েছে:
এটি বাতাস থেকে ওজোন গ্যাস নির্গত করে যা শ্বাসকষ্ট দূর করে।
প্রতিদিন তুলসী পাতা সেবন করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বাড়ে।
তুলসীর স্পর্শ মনকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে।
সারকথা: শাঁখা-সিঁদুর যেমন নারীর বাহ্যিক শাস্ত্রীয় বাধ্যবাধকতা, তুলসী সেবা তেমনি গৃহের অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতা।এই দুটি মিলেই একটি আদর্শ হিন্দু ঘর পূর্ণতা পায়।

No comments:
Post a Comment