/> হিন্দুশূন্যের পথে বাংলাদেশ - মেজর (অব.) সুধীর সাহা - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

হিন্দুশূন্যের পথে বাংলাদেশ - মেজর (অব.) সুধীর সাহা

 





বাংলাদেশে হঠাৎ দেখা যায়, পাশের বাড়ি তালাবদ্ধ- ইন্ডিয়া চলে গেছে। একবস্ত্রে, শূন্য হাতে, রাতের আঁধারে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা হাজার হাজার পরিবারের কাহিনি আমাদের জানা। বাংলাদেশ এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যালঘু হিন্দু ১৯৪৬ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে স্থানচ্যূত হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে আজকের দিনটিতেও। বিশ্বযুদ্ধে ৬ কোটি মানুষ গৃহচ্যুত হয়েছিল। তার মধ্যে ১ দশমিক ২ কোটিই ছিল জার্মানি। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে ১৯৪৮ সালে এবং তার পরবর্তী ঘটনাক্রমে ঘরছাড়া হয়েছিল ৫১ লাখ মানুষ। সেখানকার আগুন এখনো জ্বলছে। পৃথিবীব্যাপী এর প্রতিবাদও হচ্ছে। কিন্তু ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে সেখানে। সিরিয়ায় অতি সম্প্রতি গৃহযুদ্ধে ১৩৫ লাখ মানুষ গৃহচ্যুত হয়েছে। ইরাকে আইসিস, তুরস্ক আর আমেরিকার ত্রিমুখী তাণ্ডবে গৃহচ্যুত প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ। যুগোশ্লাভিয়ায় ১৯৯৬ নাগাদ ২৭ লক্ষ, আফগানিস্তানে হেকমতিয়ারের সময় থেকে আজ পর্যন্ত গৃহচ্যুত ২৬ লক্ষ। পৃথিবীর সর্বত্র সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ যেন একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ইতিমধ্যেই আমরা প্রমাণ করেছি যে, আমরা সাম্প্রদায়িকতার কাছে পরাস্ত।


ঝড়ে, বন্যায়, খরায়, অগ্নিকাণ্ডে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়; কিন্তু তারপরও আবার ওঠে দাঁড়ায়। কিন্তু ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতি হারানো জাতি হারায় নিজস্ব অস্তিত্ব। এমনটা দেখতে বেশি দূরে যেতে হবে না, ভারতের দিকে তাকালেই হবে। আটাত্তর বছর আগে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের মানুষ। সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ অনেকেই ছিলেন বড় ব্যবসায়ীসম্পন্ন পরিবারের। মাত্র কয়েকদিনের নোটিশে সব ছেড়েছুঁড়ে তাদের চলে আসতে হয়েছিল ভারতে। তারা পুনর্বাসিত হয়েছিলেন মূলত মহারাষ্ট্রে, গুজরাতে। সিন্ধি সম্প্রদায়ের লোকেরা ভারতে বেশ স্বচ্ছল, আর্থিক সমস্যা তাদের নেই; কিন্তু জাতি হিসেবে তারা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ভারতের কাশ্মীরে একসময় পণ্ডিতদের ছিল প্রতিপত্তি। কিন্তু কাশ্মীরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাদেরকে একসময় কাশ্মীর ছেড়ে ভারতের অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল।  তাদের প্রিয় মাতৃভূমির সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের যোগসূত্র ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে তাদের পারিবারিক বন্ধন, কমে যাচ্ছে শিশু জন্মহার। ফলে তাদের রাজনৈতিক গুরুত্বও হারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি আরও একটি জাতি দেড় হাজার বছর আগে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে বিশেষ করে গুজরাতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই পার্সিদের ভারতে এসে সবার আগে যেটা হারাতে হয়েছিল, তা তাদের নিজস্ব ভাষা। তাদের ভারতীয় ভাষা গ্রহণ করতে হয়েছিল। সংস্কৃতি রক্ষার চেষ্টা তাদের থাকলেও দেড় হাজার বছর ধরে ভারতে সসম্মানে টিকে থাকা ধনী প্রগতিশীল পার্সি সমাজ আজকের দিনে এসে জনসংখ্যার বিচারে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে এসে উদ্বাস্তু হওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের সামনে একটি সুবিধাজনক অবস্থা ছিল এবং আছে এবং তা পশ্চিমবঙ্গ। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির মিল থাকায় বাংলাদেশের হিন্দুরা বাঙালিয়ানার সত্তা পশ্চিমবঙ্গে এসে তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখার কাজটি সহজে করতে পারছে। কিন্তু দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আসা যেসব হিন্দু উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অন্যান্য অংশে আশ্রয় নিতে হয়েছে, তারা ক্রমশ তাদের বাঙালি অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের বাংলা বই, গান, বাংলা চলচ্চিত্র, পূজাপার্বণ এখনো তাদেরকে বাঙালি করে রেখেছে ঠিকই; কিন্তু উত্তরখণ্ডে, ওড়িশায় বা দণ্ডকারণ্যবাসী উদ্বাস্তুরা অনেকেই আজ আর বাংলা পড়তে পারে না, বাংলা বলতে পারে না। তাই তারাও ক্রমশ কাশ্মীরি বা সিন্ধি সমাজের মতো হারিয়ে ফেলছে ঐতিহ্যগত যোগসূত্র। 


ভারত ভাগ ছিল এ উপমহাদেশের বৃহত্তম ট্র্যাজেডি। বাংলা ভাগ ছিল তার থেকেও বড় ট্র্যাজেডি এ অঞ্চলের বাঙালিদের জন্য। দেশভাগ শুধু দুই দেশের সীমানা রেখা নয়; দেশভাগ সমাজ-মন-সংসার-বিশ্বাস-সংস্কৃতি-স্বজন সবকিছু ভাঙনের বিপর্যয়ের নাম। এই দেশভাগের কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের কত বাঙালিদের জনসম্পদ, জমি, ঘর-বাড়ি এবং স্মৃতি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতের কঠিন বাস্তবতার নিকট আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে পরিচয়হীন এক নিথর জীবনকে। মাকে হারানোর সেই গলার ভেতরে দলাপাকানো কান্না জমা থাকলেও শিকড় বিচ্ছেদের এই বাস্তবতা পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠীকে মেনে নিতে হয়েছিল এবং আজও সেভাবেই মেনে নিতে হচ্ছে। আজকের পৃথিবীতেও এমন স্বজন হারানো বোবাকান্না দেখছে দুটি দেশ- বাংলাদেশ আর ভারত তথা সারা পৃথিবী। এই নিদারুণ ডায়াসপোরাকে মেনে নিচ্ছে তারা। মেনে নিচ্ছে দাঙ্গা, হত্যা, অত্যাচার আর হিংস্রতার ইতিহাস। দণ্ডকারণ্যের গহিন অরণ্যে, আন্দামানের কালাপানিতে, পশ্চিমবঙ্গের ক্যাম্পে-ক্যাম্পে কিংবা বরিশাল থেকে গোয়ালন্দ ঘাটে খুলনার স্টিমারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো অগণিত মানুষের মিছিলে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা- অদম্য বাসনা। তবুও সে বাঁচতে চায়। জীবনের এমনই বেপরোয়া চাহিদা। সব শেষ হয়ে গেলেও শুধু প্রাণটা বাঁচাতে মরিয়া। দেশ ছেড়ে আসার সময় তাই তার কানে বারবার বাজে শুধু মোমিন মাঝির শ্রমের ঘামমোছা গামছা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে শেষ প্রশ্ন- এই জন্মে আমাদের আর দেখা হইবে না?


বাংলাদেশে ২০১১ সালের লোকগণনা বলছে, হিন্দুদের সংখ্যা ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। কিন্তু ১৯০১ সালে এই অঞ্চলে হিন্দু লোকসংখ্যা ছিল ৩৩ শতাংশ (৯৫ লক্ষ)। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ২ কোটি ৭৮ লক্ষ মুসলমান ছিল। সেই সংখ্যা ২০২০ সালে ৬ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটিতে। লোকবৃদ্ধির হার অনুসরণ করলে ২০১১ সালে হিন্দুদের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ৭ কোটিরও বেশি। বাস্তবে এই সংখ্যা ১ কোটি ২৪ লক্ষ। সুস্পষ্ট হিসাবে, পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৫ কোটি বাংলাদেশি হিন্দু বাংলাদেশে নেই- অন্যত্র প্রতিপালিত হচ্ছে। 


মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক 

ceo@ilcb.net 

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad