/> ধর্ম হোক আত্মশুদ্ধির আয়না, আত্মপ্রচারের মঞ্চ নয় - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

ধর্ম হোক আত্মশুদ্ধির আয়না, আত্মপ্রচারের মঞ্চ নয়

 




যীশু সেন

ধর্ম মানুষের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ধর্ম মানুষকে কেবল উপাসনার পদ্ধতি শেখায় না; শেখায় কীভাবে মানুষ হতে হয়। সত্য, ন্যায়, সংযম, দয়া, ক্ষমা, সহমর্মিতা, বিনয় ও পরোপকার—এসব মানবিক গুণের বিকাশই ধর্মচর্চার মূল উদ্দেশ্য। বাহ্যিক আচার, আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় পরিচয় ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হতে পারে; কিন্তু সেগুলোর প্রতিফলন যদি মানুষের চরিত্র ও আচরণে না ঘটে, তাহলে সেই ধর্মচর্চার অন্তর্নিহিত সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে আত্মশুদ্ধি, সেখানে আমাদের সমাজে কখনো কখনো তার বিপরীত এক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে—আত্মপ্রচার। ধর্মীয় পরিচয়, মঞ্চ, সংগঠন, পদ-পদবি, সম্মাননা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা আনুষ্ঠানিকতাকে ব্যবহার করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার এক ধরনের প্রতিযোগিতা যেন ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ধর্ম তখন আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক অনুশীলনের বিষয় না হয়ে ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ছে।

এটি কেবল ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতার বিষয় নয়; ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক আস্থার জন্যও এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।

ধর্ম কি নিজেকে প্রদর্শনের জন্য? একজন মানুষ কতবার উপাসনালয়ে গেলেন, কতটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলেন, কতজন তাঁকে সম্মাননা দিলেন, কতটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ছবি প্রকাশ করলেন—এসব দিয়ে তাঁর ধর্মীয়তার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।

ধর্মের আসল পরীক্ষা হয় মানুষের নীরব জীবনে।

অন্যায়ের সুযোগ পেলে তিনি কী করেন? দুর্বল ও অসহায় মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ কেমন? নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন কি না? ক্ষমতা হাতে এলে বিনয়ী থাকতে পারেন কি না? অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান কি না? নিজের ভুল স্বীকার করার নৈতিক সাহস রাখেন কি না? প্রতিপক্ষের প্রতিও ন্যায়বোধ বজায় রাখেন কি না?এসব প্রশ্নের উত্তরেই মানুষের ধর্মীয় চেতনার প্রকৃত পরিচয় নিহিত।

কিন্তু বাস্তবে কখনো দেখা যায়, ধর্মীয় পরিচয়কে কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সক্রিয়তা, বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবি, বিশেষ অতিথির আসন, সম্মাননা, ক্রেস্ট, ব্যানার, প্রচার, নামের আগে অতি-পদবী যুক্ত করা —সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে একটি বিশেষ সামাজিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

এখানে সমস্যাটি পদে নয়, পদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে। সমস্যাটি সম্মাননায় নয়, সম্মাননার প্রতি অতি-মোহে। সমস্যাটি প্রচারে নয়, যখন প্রচারই কাজের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।

কথায় ধর্ম, আচরণে স্বার্থ? ধর্মীয় মঞ্চে ন্যায়, সত্য, ত্যাগ, সংযম ও মানবসেবার কথা বলা সহজ। কঠিন হলো নিজের জীবনে সেই আদর্শের প্রয়োগ।

উচ্চকণ্ঠে ধর্মীয় বাণী উচ্চারণ করে মানুষকে আবেগাপ্লুত করা যায়; কিন্তু মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরীক্ষা হয় মঞ্চের বাইরে। 

যে ব্যক্তি ধর্মীয় বক্তৃতায় সহমর্মিতার কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে প্রতিবেশীর দুর্দশা উপেক্ষা করেন কিংবা নিজের পিতা-মাতার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকেন না; যে ব্যক্তি নিঃস্বার্থ সেবার কথা বলেন, অথচ প্রতিটি সম্পর্ককে লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে বিচার করেন—তাঁর বক্তব্য ও আচরণের এই বৈপরীত্য সমাজের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করায়।

ধর্মের ভাষা মুখস্থ করা আর ধর্মের মর্ম ধারণ করা এক বিষয় নয়। শাস্ত্রের বাণী উদ্ধৃত করা যায় কয়েক মুহূর্তে; কিন্তু সেই বাণী অনুযায়ী জীবনযাপন করতে লাগে দীর্ঘ সাধনা। মানুষের সামনে বিনয়ের কথা বলা সহজ; নিজের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অন্যকে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া সহজ; নিজের লোভ, ক্রোধ, ঈর্ষা ও স্বার্থপরতাকে সংযত করা কঠিন।

এই কঠিন সাধনার নামই আত্মশুদ্ধি।


ধর্ম হোক মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ। যখন কেউ ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করেন এবং ধর্মীয় আদর্শকে নিজের স্বার্থের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন ‘ধর্ম ব্যবসা’ কথাটি একটি সামাজিক ও নৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে আসে।

কারণ ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গা। আর বিশ্বাসের জায়গাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হলে ক্ষতিটা শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের ধর্মের প্রতি আস্থা।

ধর্মীয় সংগঠন—সেবার প্রতিষ্ঠান, না ব্যক্তিগত মঞ্চ? ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য। এসব সংগঠনের পদ কোনো ব্যক্তিগত অলংকার নয়; এটি দায়িত্বের প্রতীক।

সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, উপদেষ্টা কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ—কোনোটিই ব্যক্তিগত মর্যাদা প্রদর্শনের লাইসেন্স নয়। পদ যত বড়, দায়িত্ব ও জবাবদিহিও তত বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায়, কোনো সংগঠনে কে কোন পদে আছেন, কার সঙ্গে কার ঘনিষ্ঠতা, কে কোন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি হলেন, কার সামাজিক পরিচিতি কতটা—এসব বিষয় সংগঠনের প্রকৃত কাজের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে।

এতে সংগঠন সেবার প্রতিষ্ঠান না হয়ে ব্যক্তিগত পরিচিতি নির্মাণের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা ক্ষমতার বলয়ে থেকে কোনো পদ অর্জনের প্রবণতা। এতে সংগঠনের সাংগঠনিক গণতন্ত্র, যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ এবং সাধারণ সদস্যদের আস্থা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পদ দখল যদি যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবের ফল হয়, তাহলে সংগঠনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ নেতৃত্বের প্রকৃত ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, যোগ্যতা, ত্যাগ, সেবার মানসিকতা ও জবাবদিহি।

পদ মানুষকে বড় করে না; মানুষের কর্মই পদকে মর্যাদাপূর্ণ করে। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন আরও একটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সমাজে আলোচনা রয়েছে—কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠন কিংবা ধর্মীয় শিক্ষামূলক কার্যক্রমের আড়ালে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন, বক্তা বা আলোচক আমন্ত্রণ এবং বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ শোনা যায়।

এখানে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। মঞ্চ, প্রচার, ব্যবস্থাপনা, যাতায়াত, আপ্যায়ন, শিক্ষাসামগ্রী কিংবা অন্যান্য সাংগঠনিক ব্যয় থাকা স্বাভাবিক। বক্তা, শিল্পী বা প্রশিক্ষকের সম্মানী দেওয়াও অন্যায় নয়। বরং যথাযথ সম্মানী দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সেবা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে অর্থ উপার্জনই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, অথবা ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় অথচ আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা থাকে না।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মতান্ত্রিক হিসাব থাকা জরুরি। কারণ ধর্মের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস জড়িত; আর বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামান্য অস্পষ্টতাও বড় ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।

ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে অনুষ্ঠাননির্ভরতা

ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির পথ দেখাতে পারে—এটি নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষা যদি কেবল অনুষ্ঠান, প্রচার, ছবি, মঞ্চ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে যায়।

শিক্ষার মূল্য তার অনুষ্ঠানের সংখ্যায় নয়; মানুষের জীবনে তার প্রভাব কতটা পড়ছে, তাতেই তার সার্থকতা।

একজন শিক্ষার্থী যদি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে আরও সত্যবাদী, দায়িত্বশীল, সহনশীল, বিনয়ী ও মানবিক হয়ে ওঠে—তবেই সেই শিক্ষা সফল। শুধু নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন, বক্তা আমন্ত্রণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।

ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের যুগে ধর্মের সংকট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ নিজের কাজ, অর্জন ও পরিচিতিকে সহজেই সবার সামনে তুলে ধরতে পারে। এটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু যখন কাজের চেয়ে কাজের প্রচার বড় হয়ে যায়, তখন সমস্যা তৈরি হয়।

একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলো—ছবি তোলা হলো; সম্মাননা দেওয়া হলো—ছবি প্রকাশ হলো; কোনো পদ পাওয়া গেল—ব্যানার হলো; কোনো বক্তৃতা হলো—তার প্রচার হলো। ধীরে ধীরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কাজের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় ‘মানুষের জন্য কিছু করা’ নয়, বরং ‘মানুষকে দেখানো যে আমি কিছু করছি’।

এই পার্থক্যটি সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আত্মশুদ্ধি মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়; আত্মপ্রচার মানুষকে ক্রমাগত অন্যের দৃষ্টির দিকে তাকাতে শেখায়। সুবিধাবাদী সম্পর্কের ধর্মীয় মুখোশ আত্মপ্রচারনির্ভরতার সঙ্গে সুবিধাবাদী সম্পর্কেরও একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। যেখানে সুবিধা আছে, সেখানে ঘনিষ্ঠতা; যেখানে স্বার্থ নেই, সেখানে দূরত্ব—এ ধরনের সম্পর্ক ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধর্ম মানুষকে কৃতজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। মানুষকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে পরে ভুলে যাওয়া ধর্মের শিক্ষা হতে পারে না।

বিশেষ করে সংগঠনকেন্দ্রিক সামাজিক জীবনে এই প্রবণতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। ব্যক্তিগত স্বার্থে সম্পর্ক তৈরি, পদ পাওয়ার জন্য যোগাযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সুবিধা শেষ হলে সম্পর্ক ছিন্ন—এসব আচরণ কোনোভাবেই ধর্মীয় বা মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হন

ধর্মের নামে আত্মপ্রচারের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। ধর্মের গভীর দর্শন ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় সীমিত, তাঁরা অনেক সময় বাহ্যিক চাকচিক্যকেই ধর্মীয়তার প্রমাণ বলে ধরে নেন।

বিশেষ পোশাক ও বেশধরা, ধর্মীয় শব্দের ব্যবহার, আবেগপূর্ণ বক্তব্য, বড় মঞ্চ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার কিংবা নানা আনুষ্ঠানিক পরিচয়—এসব দেখে কাউকে ধর্মপ্রাণ মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এগুলো কোনো ব্যক্তির নৈতিকতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

ধর্মীয় পরিচয় বাহ্যিক হতে পারে; ধর্মীয়তা অবশ্যই আচরণে প্রকাশ পেতে হয়। তাই আমাদের বিচারবোধকে আরও পরিণত করতে হবে। কে কত সুন্দর কথা বলেন—তার পাশাপাশি দেখতে হবে, তিনি কতটা সুন্দরভাবে বাঁচেন। কে কত বড় পদে আছেন—তার পাশাপাশি দেখতে হবে, তিনি কতটা দায়িত্বশীল। কে কত সম্মাননা পেয়েছেন—তার পাশাপাশি দেখতে হবে, তাঁর কাজ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।

ধর্মের নামে বিভাজন নয়, সহাবস্থান

আত্মপ্রচারনির্ভর ধর্মচর্চার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো বিভাজন। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ধর্মীয়ভাবে অধিকতর শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন অন্যের প্রতি অবজ্ঞা, অসহিষ্ণুতা কিংবা দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

অথচ প্রকৃত ধর্ম মানুষকে বিনয়ী করে। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা এবং অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি সভ্য ও বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থানের ভিত্তিই হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

ধর্মের নামে যদি অহংকার বাড়ে, সেখানে আত্মশুদ্ধির ঘাটতি আছে।ধর্মের নামে যদি বিদ্বেষ বাড়ে, সেখানে মানবিকতার ঘাটতি আছে।

ধর্মের নামে যদি ব্যক্তিস্বার্থ বাড়ে, সেখানে ধর্মের মর্মবাণী থেকে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

আত্মসমালোচনা ছাড়া ধর্মচর্চা অসম্পূর্ণ

আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনার।

আমরা অন্যের ধর্মীয় ভুল দেখতে অত্যন্ত আগ্রহী; কিন্তু নিজের আচরণের ভুল দেখতে কতটা প্রস্তুত? অন্যের ভণ্ডামি নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের দ্বিধা নেই; কিন্তু নিজের মধ্যে কতটা অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, অসহিষ্ণুতা কিংবা সুবিধাবাদ কাজ করছে—সে প্রশ্নটি কতজন নিজেকে করেন?

অথচ আত্মশুদ্ধির শুরুই হয় নিজের দিকে তাকানো থেকে।

ধর্মীয় মানুষ হওয়ার অর্থ নিখুঁত মানুষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করাই প্রকৃত ধর্মীয় সাধনা। যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারেন, ক্ষমা চাইতে পারেন, অন্যকে ক্ষমা করতে পারেন এবং প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করার চেষ্টা করেন—তিনি ধর্মের মর্মের অনেক কাছাকাছি।

ধর্মের প্রকৃত সাধনা অন্যকে বদলানোর আগে নিজেকে বদলানোর সাধনা। প্রচারের আলো নয়, কর্মের আলো। একজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষের আলাদা করে নিজেকে ধর্মপ্রাণ প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় না। তাঁর সততা তাঁকে পরিচিত করে, তাঁর বিনয় তাঁকে সম্মানিত করে, তাঁর মানবিকতা তাঁকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে এবং তাঁর নীরব সেবা তাঁর পরিচয় বহন করে। সব ভালো কাজ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় না। সব সেবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয় না। সব মানবিকতার ছবি তুলে প্রকাশ করতে হয় না।

কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় কাজটি ঘটে সম্পূর্ণ নীরবে—কেউ জানে না, কোনো ক্যামেরা থাকে না, কোনো মঞ্চে নাম ঘোষণা হয় না, কোনো ক্রেস্ট পাওয়া যায় না। অথচ সেই নীরব কাজটি হয়তো একজন মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালায়, একটি পরিবারকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে কিংবা একজন অসহায় মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেয়। সেই নীরব মানবসেবার মধ্যেই ধর্মের প্রকৃত শক্তি নিহিত। এখন প্রয়োজন ধর্মকে তার মূল জায়গায় ফিরিয়ে আনা

ধর্মকে আত্মপ্রচারের সিঁড়ি বানানো বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আদর্শ, সেবা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রভাব নয়, যোগ্যতা; পরিচিতি নয়, সততা; পদলোভ নয়, ত্যাগ; ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, জনকল্যাণ—এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ধর্মীয় সংগঠনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব রাখতে হবে। সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের আস্থা রক্ষায় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে অনুষ্ঠাননির্ভর না করে চরিত্র ও মানবিকতা গঠনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ধর্মীয় বক্তা, শিক্ষক, সংগঠক ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদেরও মনে রাখতে হবে—মঞ্চের বক্তব্যের চেয়ে ব্যক্তিগত আচরণের প্রভাব অনেক গভীর।

আর সাধারণ মানুষকেও বাহ্যিক পরিচয়ের মোহ থেকে বেরিয়ে চরিত্র ও কর্ম দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করতে হবে।

ধর্ম অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য নয়; প্রথমে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য। ধর্ম অন্যকে দেখানোর বিষয় নয়; নিজের ভেতরকে দেখার আয়না। ধর্মীয় পরিচয় যত বড়ই হোক, চরিত্র যদি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে সেই পরিচয়ের মূল্য ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যায়।

আজ তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি কতটা ধর্মীয়, তা নয়; আমার ধর্ম আমাকে কতটা মানুষ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই ধর্মচর্চার প্রকৃত অর্থ নিহিত। ধর্ম হোক না নাম-পরিচয়ের প্রদর্শনী, পদ-পদবির প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার। ধর্ম হোক মানুষের কল্যাণের পথ, নৈতিকতার অনুশীলন, সত্যের সাধনা এবং আত্মশুদ্ধির নিরন্তর যাত্রা।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার পোশাক, পদবি, মঞ্চ কিংবা সম্মাননা দিয়ে বিচার করা হয় না; বিচার করা হয় তার চরিত্র, কর্ম, সততা ও মানবিকতা দিয়ে।

ধর্মের সবচেয়ে বড় প্রচারক কোনো বক্তা নন—একজন সৎ মানুষ। ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় কোনো পদবি নয়—একটি নির্মল চরিত্র।

ধর্ম হোক আত্মশুদ্ধির আয়না, আত্মপ্রচারের মঞ্চ নয়। ধর্ম হোক মানবতার আলো, ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার নয়।


লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad