বিজয় সরকার, সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো চিফ - সনাতন টিভি।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১০নং নাজিরাবাদ ইউনিয়ন ও ৯নং আমতৈল ইউনিয়নের মধ্যবর্তী আগনসী মৌজায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুর দেবস্থলী বর্তমানে নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় ভক্ত ও এলাকাবাসীর বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন একটি জাগ্রত দেবস্থলী, যা যুগ যুগ ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থা, ভক্তি ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।
এই দেবোত্তর সম্পত্তির আয়তন ৩০ শতকেরও বেশি। দেবস্থলীর চারপাশে রয়েছে শতবর্ষী বৃক্ষ, যা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, বহন করছে বহু প্রজন্মের স্মৃতি ও ইতিহাস। ভক্তদের সুবিধার্থে এখানে রয়েছে একটি পুকুর, যেখানে ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভক্তরা সমবেত হন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দেবস্থলীর সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে কোনো লিখিত তথ্য বর্তমানে পাওয়া না গেলেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা জনশ্রুতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে একে প্রায় হাজার বছরের পুরাতন দেবস্থলী হিসেবে গণ্য করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই স্থানটি আশপাশের অসংখ্য মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ হাজার ভক্ত পরিবার সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুরের বিশেষ পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্থানীয় ভক্তদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও বহু ভক্ত দেবস্থলীতে এসে প্রার্থনা, পূজা ও মানত প্রদান করেন।
বিশেষ করে প্রতি বছর চৈত্র মাসে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী বারুণী মেলা। পুরো মাসজুড়ে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই মেলায় হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। ভক্তদের অনেকেই এখানে বিভিন্ন মানত করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী, অনেক পরিবার তাদের শিশুদের জীবনের শুভ সূচনার অংশ হিসেবে এখানে চৈতন্য বা মাথার টিকলি প্রদান করেন।
বর্তমানে দেবস্থলীটির পুনর্নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পুনর্নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ভক্তদের জন্য আরও উন্নত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে।
সনাতন টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেবস্থলী পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রী নিতাই পদ দাশ রায় বলেন,
“ছোটবেলা থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে শুনে আসছি, শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুর অত্যন্ত জাগ্রত দেবতা। যুগ যুগ ধরে অসংখ্য ভক্ত এখানে এসে মানত করেছেন এবং আশীর্বাদ লাভ করেছেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এক সময় এই অঞ্চলে কলেরার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সাদা ঘোড়ায় আরোহী কালাচাঁদ ঠাকুর দেবস্থলীর আশপাশে বিচরণ করতেন এবং তাঁর কৃপায় আশপাশের মৌজার মানুষ মহামারির কবল থেকে রক্ষা পেতেন।”
তিনি আরও বলেন,
“এই দেবস্থলী শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি আমাদের বিশ্বাস, ভক্তি, ঐতিহ্য ও আত্মিক শক্তির প্রতীক। বর্তমানে সকল ভক্তের সহযোগিতায় পুনর্নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। আমি বিশ্বাস করি, কালাচাঁদ ঠাকুরের আশীর্বাদ এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই পবিত্র তীর্থস্থান আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বৃহত্তর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।”
অন্যদিকে সনাতন টিভিকে সাধারণ সম্পাদক শ্রী মনোরঞ্জন দাশ বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এই ঐতিহ্যবাহী দেবস্থলীকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে আমরা সকল ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এর অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন,
“যারা ইতোমধ্যে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে সহযোগিতা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, তাদের সকলের প্রতি আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমাদের বিশ্বাস, ভক্তদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুরের কৃপায় এই দেবস্থলী আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত ও সমৃদ্ধ হবে। আমরা কালাচাঁদ ঠাকুরের চরণে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকল ভক্ত, দাতা ও দেশবাসীর জীবনে শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল বর্ষণ করেন।”
স্থানীয় ভক্তদের মতে, শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুর দেবস্থলী শুধু একটি পূজার স্থান নয়, এটি বহু প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ধারক। শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়া, পবিত্র পুকুর, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বারুণী মেলার ঐতিহ্য মিলিয়ে এই দেবস্থলী আজও এলাকার সনাতনী সমাজের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
পুনর্নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এই প্রাচীন দেবস্থলী নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশা করছেন ভক্তবৃন্দ। তাদের প্রত্যাশা, কালাচাঁদ ঠাকুরের আশীর্বাদে হাজার বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই পবিত্র তীর্থস্থান আগামী দিনেও ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকবর্তিকা হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।
Post Top Ad
Home
Unlabelled
মৌলভীবাজারের হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুর দেবস্থলী, চলছে পুনর্নির্মাণ কাজ
মৌলভীবাজারের হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী শ্রী শ্রী কালাচাঁদ ঠাকুর দেবস্থলী, চলছে পুনর্নির্মাণ কাজ
Subscribe to:
Post Comments (Atom)


No comments:
Post a Comment