/> চাচা-ভাতিজার দ্বন্দ্বের জেরে খুন হন নয়ন সাধু - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

চাচা-ভাতিজার দ্বন্দ্বের জেরে খুন হন নয়ন সাধু

 




কক্সবাজার প্রতিনিধি অন্তর দে বিশাল


⚫ পাহাড়ি জমি বিক্রির টাকা নিয়ে চাচা-ভাতিজার মধ্যে চলছিল অন্তর্কোন্দল

⚫ ভাতিজাদের ঘর প্রতি দিতে হতো অতিরিক্ত টাকা

⚫ টাকা না দিলে রাতের আঁধারে নিয়ে যাওয়া হতো ঘরের টিন ও আসবাবপত্র

⚫ দায় অন্যদিকে চাপাতে মন্দিরের জমি ও দুই সাধুর দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে হত্যা


সারাদেশে আলোচিত কক্সবাজারের সেবায়েত নয়ন সাধু হত্যাকাণ্ড। কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের পূর্ব হামজার ডেইল পুলিশ্যা ঘোনায় প্রতিষ্ঠিত শিব-কালী মন্দিরের জমিসহ আশপাশের পাহাড়ি জমির মালিকানা দ্বন্দ্বের জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে সেবায়েত নয়ন সাধুকে। 

নিখোঁজের তিন দিন পর, গত ২২ এপ্রিল বেলা ১২ টার দিকে গহীন পাহাড়ের ভেতর গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় নয়ন সাধুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

সেই থেকে নয়ন সাধু হত্যার ঘটনাটি সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কেন হত্যা করা হলো এক নিরীহ সাধুকে? কে বা কারা জড়িত এই হত্যাকাণ্ডে—উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।


অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ৪ বছর পূর্বে পুলিশ্যা ঘোনার পাহাড় বিক্রির উদ্দেশ্যে পাহাড়ের চূড়ায় আগুন ওঠার দাবি তুলে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন আবুল হোসেন নামের এক দখলদার। 

এ লক্ষ্যে পাহাড়ি জমির দখলীয় মালিক আবুল হোছন, খুরুশকুল রুদ্র পাড়া এলাকার চিত্ত রুদ্রের মাধ্যমে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এলাকার সুকুমার ব্রহ্মচারী নামের এক সাধুকে প্রস্তাব দেন।

তিনি জমির মালিকের কথায় রাজি হয়ে আবুল হোছনের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে পাহাড়ের একটি মন্দির গড়ে তোলেন, যার নাম রাখা হয় “শ্রী শ্রী শিব কালী মন্দির”।

পাহাড়ের ভেতরে মন্দির প্রতিষ্ঠার সুবাদে মন্দিরের আশপাশের পাহাড়ি জমি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছে গণ্ডা/শতক আকারে বিক্রি শুরু করেন দখল মালিক আবুল হোছন।


পাহাড়ি জমি বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তার ভাতিজা বহু মামলার আসামি হেলাল, আব্দুর রহিম ওরফে একপিচ্ছা, সেলিম, শহিদুল্লাহ মেনে নিতে না পেরে জমি ক্রেতা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ক্রয়কৃত জমিতে ঘর করতে হলে তাদেরকে অতিরিক্ত ৫-১০ হাজার টাকা দিতে হতো। আর টাকা না দিলে রাতের বেলা ঘরের টিন ও আসবাবপত্র নিয়ে যাওয়া হতো বলে জানান ভুক্তভোগীরা।


জমি ক্রয়কারী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বিষয়টি আবুল হোছনকে অবগত করলে ভাতিজাদের সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার কথা কাটাকাটি ও মারামারির ঘটনাও ঘটে বলে সূত্র জানায়।

সংবাদের ২য় অংশ....

দখল মালিক আবুল হোছন সম্প্রতি মন্দিরের পূর্ব পাশে (নিচে) একটি জমি বিক্রি করে দখল বুঝিয়ে দিলে ভাতিজারা বাধা দেয়। শুরু হয় হট্টগোল। তখন ভাতিজারা ঘোনার মধ্যে জমি ক্রয় করা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বিতাড়িত করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা তা করার ঘোষণা দিয়েছিল বলে সূত্র আরো জানায়।


অভিযোগ রয়েছে, ঈদগাহ-ঈদগড় সড়কে সক্রিয় ডাকাত দলের সঙ্গে আবুল হোসেনের ভাতিজা হেলালের গভীর সখ্যতা রয়েছে। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

শুধু তার বিরুদ্ধেই নয়, আবুল হোসেনের অপর ভাতিজা আব্দুর রহিম ওরফে একপিচ্চার বিরুদ্ধে রয়েছে ৩টি, শহিদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৪টি এবং সেলিমের বিরুদ্ধে রয়েছে ১টি মামলা।


এদিকে এসব বিষয়ে কথিত ভূমি দাতা আবুল হোছনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার সঙ্গে ভাতিজাদের কোনো বিরোধ নেই। এমনকি তিনি কিছু জানান না বলে সাফ জানিয়ে দেন।


অথচ একাধিক ভুক্তভোগীরা এসব বিষয়ে স্বীকার করলেও। ভাতিজাদের ভয়ে সেই সব লুকানোর চেষ্টা করছেন আবুল হোসেন। যাতে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে ভাতিজাদের অপরাধ দামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এ আবুল হোসেন। 


অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সুকুমার ব্রহ্মচারী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করার পর হঠাৎ তার স্ত্রী মারা গেলে তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে নিজ বাড়িতে চলে যান। সেই সুযোগে জমির মালিক আবুল হোছন একই জমি মন্দিরের পাশে জমি ক্রয় করা খুরুশকুল রুদ্র পাড়ার চিত্ত রুদ্র, শহরের হরিজন পাড়ার রনি, রাজু ও বিডিআর ক্যাম্প এলাকার লিটনদের নামে নতুন করে আরেকটি কাগজ সৃষ্টি করে দেন। তখন তারা মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে সঞ্জয় সাধুকে নিয়ে আসেন।

কয়েক মাস পর প্রতিষ্ঠাতা সুকুমার ব্রহ্মচারী নয়ন সাধু ও তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে এসে দেখেন, সেবায়েত হিসেবে নতুন আরেকজন সাধুকে রাখা হয়েছে—সঞ্জয় সাধু। 

তখন তিনি জমির মালিক আবুল হোছনের সঙ্গে কথা বলে মন্দিরের পাশে নয়ন সাধুর স্ব-পরিবারে থাকার জন্য একটি ঘর করে দেন। আর সঞ্জয় সাধু মন্দিরের ভেতরে থাকতেন।

একটি মন্দিরে সেবায়েত হিসেবে দুইজন সাধু থাকায় বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। একজনের পূজা অন্যজনের পছন্দ হতো না, একজনের চলাফেরা অন্যজন পছন্দ করতেন না। 


একপর্যায়ে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা সুকুমার ব্রহ্মচারী, ভূমি দাতা আবুল হোছন, চিত্ত রুদ্র, রনি, রাজু, লিটনসহ আরও লোকজন মিলে বৈঠকে বসে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। ওই বৈঠকে সুকুমার ব্রহ্মচারী জানতে পারেন, মন্দিরের জমি নিয়ে নতুন করে আরেকটি কাগজ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এরপর আবুল হোছন চিত্ত রুদ্রের মাধ্যমে সুকুমার ব্রহ্মচারীর কাছ থেকে জমি দানের কাগজটি কৌশলে নিয়ে নেন এবং সঞ্জয় সাধুকে পাহাড়ের আরও গহীন  জঞ্জলে আরেকটি মন্দির করার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেন। সঞ্জয় সাধু সেখানে নতুন মন্দির করে বসবাস শুরু করেন। 

একপর্যায়ে হটাৎ করে তিনি পুরাতন মন্দিরের “পূজার ঘট” চুরি করে নিয়ে গেলে গণ্ডগোল শুরু হয়। পরে নয়ন সাধুসহ অন্যদের হস্তক্ষেপে তা ফেরত দিতে বাধ্য হন সঞ্জয় সাধু। এসব বিষয় নিয়ে নয়ন সাধু ও সঞ্জয় সাধুর মধ্যে একাধিকবার তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

সংবাদের শেষ অংশ...

অনুসন্ধান উঠে এসেছে , সেই মন্দিরের পাশে ছিলো কথিত ভূমি দাতা দাবিদার আবুল হোসেনের ভাতিজা শহীদুল্লাহ্'র পানের বরজ। সেই সুবাদে সঞ্জয় সাধুর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। সঞ্জয় সাধু নিয়মিতভাবে তাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার নয়ন সাধুর সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্ব ও মন্দিরের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো জানাতেন।

মন্দিরের সেবায়েত দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে আবুল হোছনের ভাতিজারা চাচার সঙ্গে চলমান বিরোধের জেরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে ওই পাহাড় থেকে বিতাড়িত করতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


অনুসন্ধানকালে এক যুবকের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, ঘটনার রাতে পাহাড়ি রাস্তায় মুখোশধারী চারজন অস্ত্রধারীর মুখোমুখি হন তিনি। সারাদিন মিশুক গাড়ি চালিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ্যা ঘোনার দক্ষিণ পাশের পাহাড়ি রাস্তায় একজনকে সন্দেহজনকভাবে দেখে টর্চের আলো ফেলেন। তখন চোর সন্দেহে তাকে ধাওয়া করলে পাহাড় থেকে আরও তিনজন বের হয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলে।

তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্রের উল্টো পিঠ দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তাকে আহত করা হয় এবং বিষয়টি কাউকে না বলতে হুমকি দেওয়া হয়।

তিনি জানান, তাদের মধ্যে একজনকে আবুল হোছনের ভাতিজা হেলাল হিসেবে শনাক্ত করেন। পরদিন হেলাল তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করে। 

আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নয়ন সাধু নিখোঁজ হওয়ার পরই কথিত ভূমির মালিক আবুল হোসেনের ভাতিজা হেলাল ও আব্দুর রহিম ওরফে ‘একপিচ্ছা’ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। 


এদিকে, আবুল হোছনের ভাতিজা হেলাল, একপিচ্ছা, সেলিম ও শহিদুল্লাহকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নয়ন সাধু হত্যার রহস্য উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করেন হিন্দু সংগঠনের নেতারা। 


কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিটু বলেন, “এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পাহাড়ি জমি বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর এখন তাদের বিতাড়িত করে আবারও জমি বিক্রির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”


নয়ন সাধুর মৃত্যুর বিষয়ে জানতে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ. এম এ সাজেদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। তদন্ত চলমান রয়েছে।


No comments:

Post a Comment

Post Top Ad