/> মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করা খ্যাতিমান আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করা খ্যাতিমান আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

 



অজয় মিত্র

আজ (২৬ এপ্রিল) রোববার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভারতের অন্যতম খ্যাতিমান আলোকচিত্রী রঘু রাই মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।


রঘু রাই ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে প্রথম সারির আলোকচিত্রী। তিনি ভারতের দ্য স্টেটমেন্ট পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আশ্রয়শিবির ঘুরে ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্টের জীবনযাত্রা তুলে ধরেন তাঁর ক্যামেরায়।


পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দৃশ্য, চূড়ান্ত বিজয়ের পর বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে ফেরা ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন। তাঁর তোলা ছবিগুলো একদিকে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হয়ে আছে, তেমনি ছবিগুলো ব্যক্তিগতভাবে তাঁকেও আলোকচিত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে।


রঘু রাইয়ের ছেলে, আলোকচিত্রী নীতিন রাই জানিয়েছেন, গত দুই বছর ধরে তাঁর বাবা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন।


১৯৭১ সাল। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে চলছে তখন অধিকার আদায়ের লড়াই। উদ্দেশ্য, একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানকে প্রতিষ্ঠা করা। 'বাংলাদেশ' নামের একটি স্বাধীন দেশ গড়ার লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া অবাক করে দেয় পুরো বিশ্বকে। যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সেই বীভৎস, অমানবিক, বর্বর আচরণে কেঁদেছে সাধারণ মানুষের মন। নিজের জায়গা ছেড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাকে বুকে নিয়ে দেশ ত্যাগ করতে হয় অনেক নারী পুরুষকে। নতুন পরিচয়,তারা 'শরণার্থী'।


চারদিকে যখন যুদ্ধের এমন ভয়াবহ অবস্থা, বাঁচার তাগিদে মানুষের এদিক সেদিক ছুটোছুটি, ঠিক সে সময়ে মুক্তিবাহিনীদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তরুণ এক আলোকচিত্রী। ঘুরছেন দেশের এই প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার, অস্থিরতা, অমানবিকতার করুণ সব দৃশ্যপট ধারণ করছিলেন ক্যামেরা হাতে। যুদ্ধের মুহূর্ত ধারণে ছুটতে থাকা সেই আলোকচিত্রী আর কেউ নন, তিনি রঘু রাই। পুরো নাম, রঘুনাথ রাই চৌধুরী।

মুক্তিযুদ্ধের চিত্রপট জীবন্ত হয়ে মানুষের কাছে ধরা পড়ে কিছু আলোকচিত্রীর ছবিতে। জীবনের তোয়াক্কা না করে তারা বিশ্বকে দেখিয়ে গেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা। ছিল প্রাণসংহারের ঝুঁকিও। এতসব বুঝতে পারার পরেও সে সময় ছবি ধারণ করে গেছেন যারা, তাদের একজন কিংবদন্তী আলোকচিত্রী রঘু রাই।


তাঁর তোলা যুদ্ধের সে সময়ের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি দাগ কেটেছে মানুষের মনে। তাই নতুন করে তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রয়োজন বোধহয় নেই। ফটোগ্রাফির দুনিয়ার উজ্জ্বল এই মহারথী প্রত্যক্ষ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা। সে সময়ে সাধারণ মানুষের দুর্বিষহ জীবনের অধ্যায় বরাবরই তাকে ব্যথিত করেছে। সাধারণ মানুষের নিজ দেশ ছেড়ে যাবার যন্ত্রণা তাকে গ্রাস করেছে গভীরভাবে। তার ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি সেই অনুভূতিই ব্যক্ত করে যায়। নতুন প্রজন্মকে সুযোগ করে দেয় যুদ্ধের সময়ে মানুষের আর্তনাদ, চাপা কান্না ও অসহায়ত্বের অদেখা জীবন দেখার। তাঁর তোলা প্রতিটি ছবিই বলে যায় অনেককিছু।


রঘু রাইয়ের ছবিতে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম, দেশের জন্য তাদের লড়াই, শরণার্থীদের হৃদয়বিদারক সব মুহুর্ত, ক্ষুধার্তদের আহার প্রাপ্তির হাহাকার, বিজয়ের আনন্দ- সমস্ত কিছুই ফুটে উঠেছে জীবন্তভাবে।


কিংবদন্তি এই আলোকচিত্রশিল্পীর জন্ম ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে। অবিভক্ত ভারতের ঝাং (এখন পাকিস্তানের অংশ) শহরে তাঁর বেড়ে ওঠা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে তাঁর নতুন ঠিকানা হয় বিভক্ত ভারত। কিন্তু নিজ জন্মভূমিকে ভুলতে পারেননি কখনো।


পড়াশোনা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। তবে সেখানে তাঁর মন টেকেনি কখনো। মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দী করতেই তাঁর যত স্বাচ্ছন্দ্য। ১৯৬৫ সালের কথা। রঘু উপলব্ধি করেন কেবল ফটোগ্রাফিতেই তাঁর শান্তি । তাই সিদ্ধান্ত নিতেও বেশ একটা ভাবতে হয়নি। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই পা বাড়ান স্বপ্নের পথে।


পেশাগত জীবনে ১৯৬৬ সালে ফটোগ্রাফি সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন দি স্টেটসম্যান পত্রিকায়। সেখানে কর্মরত ছিলেন ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। এরপর নানা সময়ে নানা জায়গায় কাজ করে গেছেন তিনি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বিভিন্ন পুরষ্কারও। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ প্রকাশিত গল্প 'ভারতের বন্যপ্রাণীর মানব ব্যবস্থাপনা'র জন্য ১৯৯২ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'বর্ষসেরা ফটোগ্রাফার' পুরস্কার লাভ করেন।


২০০৯ সালে তিনি ফরাসি সরকার কর্তৃক অফিসার ডেস আর্টস এট ডেস লেটারস উপাধিতে ভূষিত হন। ২০১৬ সালে ভারতে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। এছাড়া 'অ্যাকাডেমি ডেস বিউক্স-আর্টস'-এর প্রথম বিজয়ী ফটোগ্রাফার হিসেবে জায়গা করে নেন রঘু রাই। ফটোগ্রাফিতে জীবন্ত কিংবদন্তিদের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এটি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং শরনার্থী নিয়ে কাজ করার ফলে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে 'পদ্মশ্রী' পুরস্কারে ভূষিত করে। 


কে জানত, ২৩ বছর বয়সী ওই তরুণই একদিন আলোকচিত্র শিল্পের জগতে সৃষ্টি করবে একের পর এক ইতিহাস। রঘু করেছেন। তাঁর ছবি যেমন ইতিহাসের অংশ হয়েছে, তেমনি তিনি নিজেও। বিভিন্ন সময়ে তাঁর তোলা ছবি যেমন মানুষকে হাসিয়েছে, তেমনি কাঁদিয়েছেও।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad