অজয় মিত্র
মানুষের জীবনের এত বৈচিত্রতা, এত উত্থান পতন, বৈষম্য - সব এসে মিশে যায় অন্তিমের নির্ধারিত স্থান শ্মশানে। জীবনের অন্তিম স্থান বা শবদাহের স্থানকে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় শাস্ত্র মতে বলে মহাশ্মশান। মানুষ হিসেবে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু বর্ণপ্রথার ভেদাভেদ ভুলে সবারই শেষ ঠিকানা মহাশ্মশান।
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির আসামবস্তিতে অবস্থিত 'কেন্দ্রীয় হিন্দু বৌদ্ধ মহাশ্মশান'। রাঙ্গামাটি শহরের বিশাল এলাকার হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান এটি। এছাড়া রাজদ্বীপ এলাকাতেও রয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধদের যৌথ মহাশ্মশান। তবে বর্তমানে পুরনো এই মহাশ্মশানগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গার সংকুলান দেখা দিয়েছে বহু আগে থেকেই। শবদাহ করা একই স্থানে একাধিকবার সৎকারও করা হচ্ছে। অনেকের পরিবারের প্রিয় মানুষের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা হচ্ছে না বলছেন স্থানীয়রা।
জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির আসামবস্তি কেন্দ্রীয় হিন্দু বৌদ্ধ মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় মৌজার হেডম্যান সুরঞ্জন দেওয়ান বলেন, 'হিন্দু ও বৌদ্ধদের জন্য নির্ধারিত মহাশ্মশানটি অনেক পুরনো হলেও এখানে বহুবছর কোনো কমিটি ছিল না। গতবছর (২০২৫) একটি পরিচালনা কমিটি করা হয়েছে। মহাশ্মশানের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু সংকট রয়েছে। মহাশ্মশানের জন্য বাউন্ডারি ওয়াল (সীমানা প্রাচীর) নেই। আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতের বেলা সৎকার কাজ করতে অসুবিধা হয়, সোলারের ব্যবস্থা থাকলেও চুরি হয়ে যায়। পৌরসভা থেকে একজন পাহারাদার থাকলেও নিয়মিত পাহারাদার দেন না। এছাড়া গবাদিপশুর অবাধে বিচরণ তো আছেই।
শ্মশান কমিটির সভাপতি বলেন, এখানে শবদাহের ক্ষেত্রে কোনো স্থান নির্ধারণ করে দেয়া নেই, তবে সাধারণত একপাশে হিন্দু ও আরেক পাশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন সৎকার করে থাকেন। শ্মশানের নিচের দিকে (কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী) খালি জায়গা থাকলেও সবাই উপরের অংশে সৎকার করতে চান, যে কারণে জায়গা সংকটের বিষয়টি উঠে আসে। তবে নিচের দিকে কিছু খালি জায়গা রয়েছে।
এদিকে, রাঙ্গামাটি জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রিজার্ভবাজার ও আশেপাশের পাড়া-মহল্লা ও রাজদ্বীপ (চক্রপাড়া) এলাকার হিন্দু ও বৌদ্ধদের জন্য নির্ধারিত হলো রাজদ্বীপ (রাজবাড়ী) মহাশ্মশান। এই বিশাল এলাকার মানুষদের অন্তিম স্থান রাজবাড়ী মহাশ্মশান। ২০১৩ সালের দিকে শবদাহের সৎকার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে গঠিত হয় রিজার্ভ বাজার 'শেষ যাত্রা শ্মাশান কমিটি'।
জানতে চাইলে শেষ যাত্রা শ্মশান কমিটির অন্যতম সদস্য জিতু সিংহ বলেন, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে রিজার্ভ বাজার পর্যন্ত ৯০-৯৫ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাজদ্বীপ শ্মাশানে সৎকার করা হয়ে থাকে। এছাড়া রাজদ্বীপ ও রিজার্ভ বাজার সমাজের যেসব এলাকার মানুষ শহরে অন্যান্য এলাকায় থাকছেন তারাও রাজদ্বীপ মহাশ্মশানেই সৎকার করেন।
শ্মশান কমিটির সদস্য জিতু সিংহ বলেন, রাজবাড়ী মহাশ্মশানে এখন পর্যাপ্ত জায়গার সংকট রয়েছে। শ্মাশানের চারদিক থেকে মাটি ধসে পড়ায় শ্মশানটি ছোট হয়ে যাচ্ছে। যদি ধারক দেওয়াল করে রক্ষাপ্রদ কাজ করা যায় সেক্ষেত্রে শ্মশানটি রক্ষা পাবে এবং পুরো স্থানজুড়ে শবদেহ সৎকার করা হবে। এছাড়া শ্মাশানের জন্য আলোর ব্যবস্থা নেই, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। এই সংকটগুলোর নিরসন দরকার। শ্মশান হওয়াতে এটির অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয় উন্নয়নের প্রতি সংশ্লিষ্টদের নজর কম।
জানতে চাইলে রাঙ্গামাটি জেলা পুরোহিত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক পুলক চক্রবর্তী বলেন, আসামবস্তি এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় হিন্দু বৌদ্ধ মহাশ্মশান ও রাজদ্বীপ (চক্রপাড়া) মহাশ্মশানটি রাঙ্গামাটি শহর এলাকার প্রায় সকল হিন্দু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মহাশ্মশান হিসেবে রয়েছে। তবে শ্মাশান গুলোতে এখন পর্যাপ্ত জায়গা সংকট তৈরি হয়েছে। রাজদ্বীপ মহাশ্মশানে রিজার্ভ বাজার, রাজদ্বীপ এলাকার মানুষ সৎকার করেন। আর আসামবস্তি মহাশ্মশানে তবলছড়ি, ভেদভেদি, বনরূপা, রিজার্ভ বাজারে এলাকার কিছু শবদেহও সৎকার করা হয়ে থাকে। বিশেষত রাজবাড়ী মহাশ্মশানে নৌ-পথে যেতে হয়, সে কারণে পারাপার ও যাতায়াতের সুবিধার কারণে বেশিরভাগই আসামবস্তি কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে নেয়া হয়।
পুলক চক্রবর্তী আরো বলেন, এখন শ্মশানগুলোতে জায়গায় সংকটের কারণে দেখা গেছে একই স্থানে একাধিকজনকে সৎকার করা হচ্ছে। এতে করে অনেকের পরিবারের মানুষটার শেষ স্মৃতি রক্ষা করা বা সংরক্ষণ যাচ্ছে না। আমাদের দীর্ঘদিনের একটা প্রচেষ্টা ছিল ইলেকট্রিক বা উন্নতমানের আগুনের চুল্লি বসানোর, কিন্তু সেটি হয়ে উঠেনি, প্রচেষ্টাতেই রয়ে গেছে। চুল্লি করা গেলে জায়গা সংকট কিছুটা নিরসনে আসতো। এখন সৎকারের জন্য যেখানে বড় স্থানের প্রয়োজন তখন চুল্লিতে সৎকার করা গেলে অল্প জায়গার মধ্যেই মৃতব্যক্তির শেষ স্মৃতি সংরক্ষণ করা যাবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দাহকার্য আধুনিকায়ন করা গেলে এই অঞ্চলের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শেষযাত্রার স্থানগুলো যেমন সুন্দর হয়ে উঠবে, তেমনি মানসিক প্রশান্তি নিয়ে স্মৃতিচিহ্নে যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদনও হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।


No comments:
Post a Comment