ডেস্ক রিপোর্টঃ
জনি চন্দ্র সূত্রধর ওরফে জনি নাথ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ১৩ মাস ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন । তার দাবি, শুধুমাত্র হিন্দু সংখ্যালঘু হওয়ায় তার বিরুদ্ধে একের পর এক ৯টি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের দিকে ছুড়ে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তিনি নিজের মুক্তি দাবি করেন।
গত ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত 'জয় বাংলা ব্রিগেড' আয়োজিত একটি জুম মিটিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যে ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে, জনি চন্দ্র সূত্রধর তাদের মধ্যে ১৮২ নম্বর আসামি। ওই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে শেখ হাসিনা তার কর্মীদের অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
সোমবার শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জন আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল। এ কারণে জনি চন্দ্র সূত্রধরসহ ৩০ জন আসামিকে ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মঈন উদ্দিন চৌধুরীর আদালতে হাজির করা হয়।
বেলা সোয়া ২টার দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা চার্জ গঠন পিছানোর আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে আগামী ১৫ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আসামিদের কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় জনি চন্দ্র সূত্রধর সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে একটি খোলা চিঠি ছুড়ে মারেন।
এ সময় তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, 'আমি শুধুমাত্র হিন্দু সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে প্রশাসন আমাকে পরপর ৯টি সাজানো মামলা দিয়েছে।' এরপর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তার মুখ চেপে ধরে তাকে হাজতখানায় নিয়ে যান।
চিঠিতে তিনি বলেন, 'আমি মুক্তি চাই, আমি মুক্তি চাই। দীর্ঘ ১৩ মাস বিনা দোষে, শুধু হিন্দু সংখ্যালঘু বাংলাদেশি হওয়ার কারণে মিথ্যা ৯টি ডিটেনশনসহ রাষ্ট্রদ্রোহের সাজানো মামলা দিয়ে প্রশাসন আমাকে কারাগারে আটক করে রেখেছে। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানায় আমার কোনো রাজনৈতিক পদবি বা মিটিং-মিছিলে অংশ নেওয়ার প্রমাণ প্রশাসন দিতে পারেনি।'
চিঠিতে আরও বলা হয়, 'মিথ্যা সাজানো মামলা দিয়ে আমার ক্যারিয়ার, পরিবার এবং বাচ্চার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সাহায্য কামনা করছি, সুষ্ঠু তদন্ত করে আমার মুক্তি চাই। আমি কি বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু হওয়াতে পাপ হয়ে গেছে? একজন সামান্য ওষুধ কোম্পানির এস আর এল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আমি বাঁচতে চাই।'
জনি সূত্রধরের স্ত্রী তৃষ্ণা সূত্রধরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'গত ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সন্দ্বীপ থানা পুলিশ আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ বলেছিল, ওসি স্যার কথা বলে সকালেই ছেড়ে দেবেন। কিন্তু মিথ্যা বলে তার বিরুদ্ধে একের পর এক ৯টি মামলা দেওয়া হয়েছে।'
'আমার স্বামী কারাগারে আটক থাকায় বাপের বাড়িতে দিন কাটছে। ছোট্ট ছেলের বয়স ৫ বছর হলেও এখানো স্কুলে দিতে পারেনি। অনেক কষ্ট দিন কাটছে। খেয়ে না খেয়ে। মিথ্যা মামলার কারণ আমার পরিবার আজকে পথে বসেছে', বলেও জানান তৃষ্ণা।
তৃষ্ণা সূত্রধর আরও জানান, স্বামীর আয়ে তাদের সংসার চলত। এখন মামলা চালাতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। মানুষের কাছে ধারদেনা করে ৭টি মামলায় জামিন পেলেও এখনও দুটি মামলা বাকি আছে। তিনি বলেন, 'গত সাত মাস ধরে স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়নি। ৫ বছরের ছোট্ট ছেলেটা প্রতিদিন বাবার জন্য কান্নাকাটি করে। আমরা বাঁচতে চাই, আমি আমার স্বামীর জামিন চাই।'
জনি চন্দ্র সূত্রধরের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন জানান, প্রায় ৬ মাস আগে এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি চার্জশিটভুক্ত ১৮২ নম্বর আসামি। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ না থাকলেও জামিন দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, 'শুধু জনি চন্দ্র সুত্রধর না, এই মামলায় সকল আসামিই জামিন পাওয়ার হকদার। আশা করি, আদালত ন্যায় বিচার করবেন।'
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো. রিপন মোল্লা বলেন, 'আসামি জনি নাথ বাংলা ব্রিগেড'র জুম মিটিংয়ে অংশ নিয়ে অন্তরর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে করা মামলার আসামি। তাকে আজকে আদালতে উপস্থিত করা হয়েছিল।'
২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন সিআইডির সহকারী বিশেষ পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক। গত ৩০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

No comments:
Post a Comment