লেখক: সাগর কর্মকার
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার,
নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নটি নতুন নয়।স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর
মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও
সমমর্যাদার জন্য দাবী জানিয়ে আসছে।সামাজিক আন্দোলন হয়েছে, বিভিন্ন সংগঠন
তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দাবি
জানানো হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও
আমাদের সামনে রয়েগেছে-শুধু দাবি জানিয়ে কি
একটি জনগোষ্ঠী তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে?
আমার বিশ্বাস, এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের
রাজনীতির দিকে তাকাতেই হবে কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক
প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নেওয়া হয়। সংসদে আইন তৈরি হয়, বাজেট নির্ধারিত হয়,
প্রশাসনিক নীতি নির্ধারিত হয় এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন
বিষয়েসিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজনৈতিক
প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। তাই কোনো জনগোষ্ঠী যদি
নিজের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিকার অর্থে
কথা বলতে চায়, তাহলে তাকে রাজনৈতিকভাবে
শক্তিশালী হতে হবে।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া সংখ্যালঘু জনগণের
স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠা কঠিন।
বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক
ইতিহাসে বাংলাদেশ হিন্দু লীগ একটি গুরুত্বপূর্ণ
নাম।১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ হিন্দু লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সরাসরি
রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি ধারার সূচনা হয়।পরবর্তীকালে এই রাজনৈতিক ধারাই বাংলাদেশ হিন্দু
মহাসভার নামে এগিয়ে চলছে।
এই ইতিহাসকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের
ইতিহাস হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর
নিজেদের অধিকার নিয়ে সরাসরি নির্বাচনী
রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার দীর্ঘ প্রচেষ্টার একটি
অধ্যায়।এর প্রমাণ আমরা অতীতের
নির্বাচনেও দেখতে পাই।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ হিন্দু লীগের প্রার্থী বীরেন্দ্রনাথ মৈত্র গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ৪ হাজার ২৪৬ ভোট পেয়েছিলেন, যা ওই আসনের
মোট ভোটের প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এর প্রার্থী অমলেন্দ্র বিশ্বাস ২১১৬ ভোট পেয়েছিলেন।এছাড়াও নড়াইল ১ আসন থেকে গোবিন্দ, যশোর ৫ আসন থেকে বিষ্ণুপদ সাহা,যশোর ৪ আসন থেকে শঙ্কর চক্রবর্তী, গোপালগঞ্জ ১ আসন থেকে সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাস এবং গোপালগঞ্জ ২ আসন থেকে শিশির বিশ্বাস অংশগ্রহণ করেন।
১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও বাংলাদেশ হিন্দু
লীগের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন।যশোর ৫ আসন থেকে শিশির বিশ্বাস এবং মাদারীপুর ৩ আসন থেকে খোকন মুন্সি অংশগ্রহণ করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনেও,বাংলাদেশ হিন্দু লীগের
প্রার্থী বীরেন্দ্রনাথ মৈত্র গোপালগঞ্জ-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
হয়তো কেউ বলবেন, এই ভোটসংখ্যা বড় নয় কথাটি সত্য।কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস শুধু জয়ের হিসাব দিয়ে
লেখা হয় না। কখনো কখনো একটি
জনগোষ্ঠী নিজের পরিচয়, অধিকার ও রাজনৈতিক
অস্তিত্ব নিয়ে নির্বাচনের মাঠে দাঁড়িয়েছে-এটিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বড় রাজনৈতিক শক্তি
একদিনে তৈরি হয় না।একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে মানুষের কাছে যেতে হয়, সংগঠন গড়ে তুলতে হয়, নেতৃত্ব তৈরি করতে হয় এবং বছরের পর বছর মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়।
এখানেই আমাদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন আসে—সংখ্যালঘু জনগণ কি শুধু অন্য
রাজনৈতিক দলের কাছে নিজেদের অধিকারের দাবি
জানিয়ে যাবে, নাকি নিজেদের মধ্য থেকেও
রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করবে?
আমি মনে করি, দ্বিতীয় পথটি নিয়ে আমাদের
গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
এর অর্থ এই নয় যে সংখ্যালঘু জনগণ অন্য
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে থাকবে না।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকের নিজের
রাজনৈতিক মত ও পছন্দের অধিকার
রয়েছে। বরং প্রয়োজন হলো—যে দলেই থাকুক না কেন, সংখ্যালঘু জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব,সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং
নীতিনির্ধারণে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব তৈরি করা।
কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ শুধু অন্যের
সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
নিজেদের কথা নিজেদের কণ্ঠে বলতে হবে। নিজেদের সমস্যার সমাধানের জন্য নিজেদের মধ্য
থেকেও নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র যোগ্য ও
জনসম্পৃক্তনেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ হিন্দু লীগ থেকে বাংলাদেশ হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক ধারাটি সেই জায়গা থেকেই মূল্যায়নের দাবি রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি হিন্দু জনগোষ্ঠীর
অধিকারকে রাজনৈতিক আলোচনার অংশ করার চেষ্টা করেছে—এটি তার ইতিহাসের একটি
উল্লেখযোগ্য দিক।
আমাদের নতুন প্রজন্মকেও রাজনীতিকে ভয় পেলে চলবে না।রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে অন্যরা আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।কিন্তু আমরা যদি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবেঅংশ নিই, নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে নেতৃত্ব তৈরি করি এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের জায়গায় পৌঁছাতে পারি, তাহলে নিজেদের অধিকার নিয়ে আরও কার্যকরভাবে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে।
আজ তাই সময় এসেছে অতীতের অভিজ্ঞতা
থেকে শিক্ষা নেওয়ার।শুধু অভিযোগ নয়, শুধু প্রতিবাদ নয়, শুধু নিরাপত্তার দাবি নয়—রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান পথ।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগণের ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটি শুধু অন্য কেউ ঠিক করে দেবে—এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজেদেরও থাকতে হবে।আর সেই কারণেই আমার জাতির কাছে আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—
আমরা কি শুধু অধিকার চাইব, নাকি অধিকার
প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক শক্তি ও নেতৃত্বও তৈরি
করব?
সংখ্যালঘু নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা, তাকে গ্রেফতার এবং আদ্যাবধি তার মুক্তি না পাওয়ার জন্য দায়ী জাতীয় রাজনীতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের অনিহা।
আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগণের
উত্তরণের আলোচনায় রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের
প্রশ্নটি আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

No comments:
Post a Comment