/> ব্যাংকে কোটি টাকা লুটের মামলায় নির্দোষ পরেশ, তবে রায়ের আগেই মৃত্যু। - Sanatan Tv
Vedic Video!Subscribe To Get Latest Vedic TipsClick Here

সাম্প্রতিক খবর

Sanatan Tv

সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান

Post Top Ad

ব্যাংকে কোটি টাকা লুটের মামলায় নির্দোষ পরেশ, তবে রায়ের আগেই মৃত্যু।

ষোলোটি বছর একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এই দীর্ঘ সময়টা ছিল এক অন্তহীন আইনি লড়াই, সামাজিক লাঞ্ছনা আর বুকভাঙা যন্ত্রণার নাম। অবশেষে আদালতের রায়ে সত্যের জয় হয়েছে, সব কলঙ্ক মুছে গিয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ফরিদপুরের জনতা ব্যাংকের তৎকালীন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস—যে সম্মানের জন্য, যে মুক্তির জন্য তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে গেলেন, সেই বিজয়ের আনন্দ নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না। আদালতের চূড়ান্ত রায় আসার আগেই চিরতরে চোখ বুজেছেন এই বৃদ্ধ। ঘটনার সূত্রপাত ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে। ফরিদপুরে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা থেকে সেদিন প্রায় কোটি টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতে ব্যাংকেই ঘুমিয়ে ছিলেন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি সেই রাতের এক ভয়াবহ বিবরণ দেন। তিনি জানান, গভীর রাতে হঠাৎ কয়েকজন দুর্বৃত্ত এসে তাঁর গলায় ছোরা ধরে তাঁকে চুপ থাকতে বলে। হামলাকারীদের মধ্যে তপু ও জাহিদ নামের দুজন ছিলেন, যারা প্রায়ই ব্যাংকের সামনে ঘোরাঘুরি করতেন এবং তাঁকে চা-চটপটি খাওয়াতেন। তারা ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন বলেও পরেশকে জানিয়েছিলেন। ঘটনার রাতে তারা পরেশকে জোর করে ৫ হাজার টাকা দেন এবং জবানবন্দিতে পরেশ পুলিশকে তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে সেই টাকা উদ্ধার করার অনুরোধ জানান, যা পরবর্তীতে পুলিশ উদ্ধারও করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তদন্ত শেষে পুলিশের দাখিল করা চার্জশিটে জাহিদের নামই আসেনি এবং মামলার অন্যতম আসামি তপু ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায়ে খালাস পেয়ে যান। সমস্ত দায় এসে পড়ে নিরীহ পরেশের ওপর। শুরু হয় এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আইনি যুদ্ধ। ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে আপিল করা হলে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁর সাজা কমিয়ে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু নিজের সততার ওপর অবিচল পরেশ দমে যাননি; তিনি এই সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট দায়রা আদালতের সেই সাজা বাতিল করে পরেশকে মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস ও অব্যাহতি দেন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক রায়ের মাত্র কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পরেশ। দীর্ঘ ১৬ বছর চোরের অপবাদ মাথায় নিয়েই দুনিয়া ছাড়তে হয় তাঁকে। বাবার এই করুণ পরিণতি আর দীর্ঘ লড়াই নিয়ে অশ্রুসজল কণ্ঠে তাঁর ছেলে প্রণব কুমার দাস বলেন যে, এই আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে তাঁর বাবাসহ পুরো পরিবারকে চরম ভোগান্তি ও হয়রানি পোহাতে হয়েছে, সামাজিকভাবেও হেয় হতে হয়েছে। আইনি লড়াই চলার মধ্যেই বাবা মারা যান, অথচ প্রকৃত অপরাধীরা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হলেও নিজের চোখে সেই রায় দেখে যেতে না পারার কষ্ট তাঁদের পরিবারকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। চুরির ঘটনার সময় পরেশ চন্দ্র দাসের চাকরির বয়স হয়েছিল প্রায় দুই যুগ। তাই বাবার মৃত্যুর পর এখন পরিবারের একটাই প্রত্যাশা—বাবা যেহেতু আজ সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, তাই তাঁর চাকরি-পরবর্তী সমস্ত প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা যেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাঁদের পরিবারকে নিশ্চিত করে। এদিকে শুধু ফৌজদারি মামলাই নয়, অর্থ উদ্ধারের জন্য জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা একটি দেওয়ানি মামলার (মানি স্যুট) প্রথম আপিলও গত ৩ ফেব্রুয়ারি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরেশের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী রিতা রানী দাস, ছেলে প্রণব কুমার দাস ও মেয়ে লিপি রানী দাস এই মামলায় বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত হয়েছিলেন। নিরীহ এই পরিবারটিকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অন্যায্যভাবে হয়রানি ও মানসিক ভোগান্তিতে ফেলার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে আপিলকারী জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণমূলক খরচ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট, যা পরেশের পরিবারের অনুকূলে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এই বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আইনজীবী আরিফ বিল্লাহ জানান, পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি এখনো তাঁদের হাতে আসেনি। অনুলিপি পাওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। শেষ বয়সে এসে পরেশ চন্দ্র দাস হয়তো আইনি মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু যে ১৬টি বছর একটি পরিবার হারিয়েছে, সেই অপূরণীয় ক্ষতি আর শূন্যতা কোনো অর্থ বা রায়ে কি কখনো পূরণ হওয়া সম্ভব?

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad