সাভারের ধলেশ্বরী নদীর তীরে এক শান্ত জনপদ এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে দখলদারিত্বের কালো ছায়ার। বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসা ৪২টি হিন্দু পরিবার এখন নিজেদের আদি ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। যে ভিটে মাটিতে পূর্ব পুরুষের স্মৃতি মিশে আছে, আজ তা রক্ষায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে অসহায় মানুষগুলো। প্রভাবশালী স্থানীয় বিএনপির পেশিশক্তির মহড়ায় এলাকাটিতে বইছে আর্তনাদ।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের পানপাড়া মহল্লায় কয়েক শতাধিক আদি হিন্দু পরিবার বসবাস করে আসছে। গত কয়েক মাস ধরে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীর মহলের চাপ ও আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে তাদের জীবন অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির সমর্থক সোহরাব উদ্দিন (ভুলু) সাভারের রাজফুলবাড়িয়ার পানপাড়া মহল্লায় ৯২ শতাংশ হিন্দু জমি নিজের জমি বলে দাবি করেন। সেই জমিতে মাঝেমধ্যেই দখল নিতে খুঁটি দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে আসে। জমি দখল নিতেও প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন হুমকি দেয়। তবে সর্বশেষ ওই পরিবার গুলোকে উচ্ছেদ করতে না পারায় আশ্রয় নেন আইনি মারপ্যাঁচে। প্রায় ৯২ শতাংশ জমি দখল নিতে ৪২ পরিবারের মূল কর্তাদের বিরুদ্ধে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসে পৃথকভাবে ২৮টির ও বেশি মামলা করেন। এদের মধ্যে খুশি মোহন রাজবংশী, আনন্দ রাজবংশী, ভজন রাজবংশী, সুশীল রাজবংশী, বিমল রাজবংশী, শ্রী ধীরেন রাজবংশী, রঘুনাথ রাজবংশী, গোরাঙ্গ সূত্রধর, রানা রাজবংশী, পলাশ রাজবংশী, কাঞ্চন রানী দাস, ফুল চান রাজবংশী, নয়ন তারা রাজবংশী, সঞ্জিত রাজবংশী, নিত্যানন্দ রাজবংশী, নারায়ণ রাজবংশীসহ ১৫ জন মামলার বিবাদী। তবে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের সার্ভেয়ার মনির হোসেন সরেজমিন প্রদর্শন করে প্রতিবেদন দিলেও এতে স্থানীয় বিএনপির সোহরাব উদ্দিন (ভুলু) না-রাজি দেন।
ভুক্তভোগী বিকাশ বলেন, আমরা পৈতৃকভাবে এই জমির মালিক। কিন্তু একজন নিজেদের জমি দাবি করে আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। আমরা তিন পুরুষ ধরে এখানে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমরা এখন ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছি। আমরা আমাদের আদি ভিটামাটিতে থাকতে চাই।
অন্যদিকে চিত্ত রাজ বংশী নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা পানপাড়া মহল্লার হিন্দুরা অনেক আতঙ্কিত আছি। আমরা স্থানীয় বিএনপির সোহরাব উদ্দিনকে বলেছি আমাদের জায়গার মধ্যে যদি তার জমি থাকে তবে সে কাগজ পত্র নিয়ে আসুক। কিন্তু সে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। সে আমাদের বলে ‘আমার কাগজ লাগব মানে, আমি তো নিজেই কাগজ’। আমরা গরিব অসহায় মানুষ আমরা কিছু করতে সাহস পাচ্ছি না। মাঝেমধ্যে সে এসে একজন একজন করে তার অফিসে ডাকে। তখনই আমরা ভয়ের মধ্যে থাকি।
অভিযুক্ত সোহরাব উদ্দিন ভুলুর কাছে জমির দখলের ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা আমার জমি দখল করে রেখেছে। আমি অনেক দিন থাকতে পারিনি। তাই তারা (হিন্দুরা) আমার জমি দখল করেছে।’
এ বিষয়ে ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান বলেন, পানপাড়া হিন্দু মহল্লায় আওয়ামী লীগের আমলেই রাস্তা দখল করে রেখেছিল। ৫ আগস্টের পরে আমাকে জানালে রাস্তা উদ্ধার করে দিয়েছি। তবে যদি কোনো সংখ্যালঘু বা কোনো ব্যক্তির জমি কেউ জোর করে দখল করে সে ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স করা হবে। ভূমিদস্যু, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজের ক্ষেত্রেও জিরো টলারেন্স। প্রধারমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের পাশে থেকে আইন অনুযায়ী সবকিছু দেখতে হবে।
এ ঘটনায় সাভার ট্যানারি ফাঁড়ির ইনচার্জ মহব্বত কবীর বলেন, হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তাদের থানায় জিডি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ বা জিডির ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

No comments:
Post a Comment